

প্রকৃতিতে রঙিন ডানায় উড়ে বেড়ানো প্রজাপতিরা যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত অলংকার। নানা রঙের মিশেলে তাদের বর্ণিল সৌন্দর্য সহজেই নজর কাড়ে। এদের অনিন্দ্যসুন্দর আলপনাময় রঙিন ডানার অপরূপ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হোন প্রকৃতিপ্রেমীসহ সববয়সী মানুষ।
গ্রীষ্মের উজ্জ্বল সকালে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার একটি সড়কের পাশের ল্যান্টানা ক্যামেরা উদ্ভিদ ঘিরে উড়তে দেখা যায় তেমনই রঙিন ডানার অপরূপ সৌন্দর্যের কয়েকটি প্রজাপতি হরতনি। সাদা, হলুদ আর লাল রঙের নকশায় সাজানো এই প্রজাপতি যেন প্রকৃতির আঁকা জীবন্ত আলপনা। প্রকৃতি ঘিরে ফুলে ফুলে এদের উড়ে বেড়ানোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে পরিবেশে এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি হয়েছিল।
জানা গেছে, হরতনি প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম ডেলিয়াস ইউকারিস। এরা মাঝারি আকারের প্রজাপতি। এরা পিয়েরিডি পরিবারের এবং পিয়েরিনি উপগোত্রের সদস্য। এদের ডানা প্রসারিত অবস্থায় ৬৬-৮৩ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে।
হরতনি প্রজাপতির পেছনের ডানা উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের, যা সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এদের ডানার শীর্ষভাগের কিছুটা আগে থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে লাল রঙের চওড়া কল্কা পাড়। পুরো সীমানাজুড়ে কাঠকয়লা রঙের রেখা এ প্রজাপতির সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
এছাড়া কাঠকয়লা রঙের দাগ ও লাল কল্কার মাঝখানে দেখা যায় সরু সাদা রেখা। ডানার ওপরের অংশ সাদা বর্ণের হলেও এী শিরাগুলো কাঠকয়লা রঙের হওয়ায় নকশাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামনের ডানার নিচের অংশও অনেকটা ওপরের অংশের মতো, তবে শীর্ষকোণে হালকা হলুদাভ আভা দেখা যায়।
সাধারণত দৃষ্টিনন্দন এই প্রজাপতির দেখা মেলে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে। ভারতের প্রায় সব অঞ্চলের পাশাপাশি পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারেও এর বিচরণ রয়েছে। প্রকৃতির রঙিন এই প্রাণীটি বনাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল ও গাছপালায় ঘেরা পরিবেশে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে।
এই প্রজাপতির স্ত্রী প্রজাপতিদের বেশিরভাগ সময় গাছের চূড়ার আশপাশে ধীরগতিতে উড়তে দেখা যায়। তারা সাধারণত খাদ্যোপযোগী উদ্ভিদের সন্ধানে অলস ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিকে পুরুষ প্রজাপতিরা তুলনামূলক বেশি চঞ্চল। ফুলের মধু সংগ্রহের জন্য এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে বেড়ানোর পাশাপাশি ভেজা মাটিতে বসে জল পান করতে এদের দেখা যায়।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. রুহুল আমিন বলেন, হরতনি প্রজাপতির দেহের রঙ ও চলাফেরা সত্যিই আকর্ষণীয় এবং অসাধারণ। আগের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে প্রজাপতি এখন কম দেখা যায়। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং সবুজের সমারোহ কমতে থাকার প্রভাবে প্রজাপতিরাও তাদের বাসযোগ্য আবাসস্থল সংকটের মধ্যে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রজাপতি শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, এরা প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এছাড়াও প্রজাপতি পরিবেশের সুস্থতারও নির্দেশক। যেখানে প্রজাপতি বা ফড়িং বেশি থাকে, সেখানে পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো তা নির্দেশ করে। এজন্য প্রকৃতিতে এদের টিকিয়ে রাখতে আমাদের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন কালবেলাকে বলেন, প্রজাপতি পরিবেশবান্ধব একটি উপকারী পতঙ্গ। কৃষিক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরাগায়নে এদের অবদান রয়েছে। এছাড়া জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রজাপতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার ও গাছপালা কমে যাওয়ায় অনেক প্রজাতির প্রজাপতি হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ পরিবেশে দেশীয় গাছপালা সংরক্ষণ এবং কম বিষ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে হরতনিসহ নানা প্রজাতির প্রজাপতির আবাসস্থল টিকে থাকবে।