

চোখে আলো নেই, কিন্তু থেমে নেই তার জীবনযুদ্ধ। নিজের অন্ধকারকে জয় করে অন্যের জীবনে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছেন আব্দুল মালেক। দৃষ্টিশক্তিহীন এই শিক্ষক টানা ১৩ বছর ধরে নিষ্ঠা, মেধা ও ভালোবাসা দিয়ে শিশুদের পাঠদান করে হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ৫২ নম্বর পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মালেকের বাড়ি নড়িয়া পৌরসভার বরুনপাড়া এলাকায়। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের আবৃত্তি, গান ও তবলা বাজানো শেখান। তার আন্তরিকতা ও বহুমুখী প্রতিভার কারণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সহকর্মীদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া মালেক মাত্র তিন বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পরিবার উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেনি। তবে তার শিক্ষাজীবন থেমে যায়নি।
১৯৯২ সালে রাজধানীর একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর এলাকায় ফিরে নড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ২০১৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান মালেক। প্রথম কর্মস্থল ছিল ১০ কি. মি দূরের কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নানা প্রতিকূলতা দূরত্বকে জয় করে তিনি দায়িত্ব পালন করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। পরে ২০২৩ সালে তাকে নিজ বাড়ির কাছাকাছি ৫২ নম্বর পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়।
দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। ল্যাপটপে বিশেষ রিডিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে পাঠ্যবই শুনে প্রস্তুতি নেন এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। শিশু শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি সংগীত শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশেও ভূমিকা রাখছেন।
আব্দুল মালেক বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক ধারণা কিছুটা হলেও বদলানোর লক্ষ্যেই শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছি। প্রযুক্তি, শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সহযোগিতায় ভালোভাবেই পাঠদান করতে পারছি। তবে ব্রেইল বই সরবরাহ করা হলে আরও কার্যকরভাবে শিক্ষাদান সম্ভব হবে।’
সহকর্মী শিক্ষক শাহনাজ আক্তার বলেন, ‘প্রথমে আমাদের মনে দ্বিধা ছিল, তিনি কীভাবে ক্লাস নেবেন। কিন্তু পরে তার কাজ দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। তার পারফরম্যান্স অনেক ক্ষেত্রেই অন্য শিক্ষকদের চেয়েও ভালো।’
শিক্ষার্থী অভিভাবক রিতা আক্তার বলেন, ‘মালেক স্যার আমার মেয়ের খুব প্রিয় শিক্ষক। তার ক্লাসে শিশুরা আনন্দ পায় এবং মনোযোগ দিয়ে শেখে। আমরা তার সাফল্য কামনা করি।’
নড়িয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করেন। একজন শিক্ষক ও মানুষ হিসেবে তিনি অসাধারণ। তার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা সচেষ্ট আছি।’
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘আব্দুল মালেক একজন প্রতিভাবান ও কর্মঠ শিক্ষক। তার জীবনসংগ্রাম এবং সমাজে অবদান সবার জন্য শিক্ষণীয়। তার কাছ থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার রয়েছে।’
ছয় ভাইবোনের মধ্যে মালেক একজন। ২০০৬ সালে তার বাবা মারা যান। বর্তমানে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তার সংসার। বড় ছেলে একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেই ছেলের সহযোগিতায় ব্যাটারিচালিত একটি স্কুটারে প্রতিদিন বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন তিনি।
দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও হার না মানা এই শিক্ষক প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই মানুষের পথচলা থামিয়ে দিতে পারে না।