সাইমন মোহসিন
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

তিন নতুন জিরো : ইউনূস সরকারের তিক্ত প্রাপ্তি

শূন্য বেকারত্ব থেকে শূন্য জনআস্থা
ড. ইউনূস। পুরোনো ছবি
ড. ইউনূস। পুরোনো ছবি

অন্তর্বর্তী সরকারের রুটিন দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তা শুরু থেকেই অগ্রাহ্য করে গেছে। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে তারা বেশি বেশি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগের দিকে ধাবিত হয়।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতা খতিয়ে দেখতে গঠন করা হয় সংস্কার কমিশন। অমীমাংসিত কাঠামোগত প্রশ্নগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে সাংবিধানিক পর্যালোচনা-আলোচনা চালানো হয়। আইনের শাসনকে শক্তিশালী করার কথা বলে প্রস্তাব করা হয় বিচার বিভাগীয় সংস্কারের উদ্যোগ। রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও জনসেবার মানোন্নয়নের উপায় হিসেবে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো অন্তর্বর্তী সরকারই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য এ ধরনের বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করে নাই। অথচ তাদের স্মরণে রাখা উচিত ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের এ এখতিয়ার রাখে কিনা?

কারো প্রতিটি সুপারিশ বা প্রস্তাবের সঙ্গেই সবার একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছিল। সব বিষয়েই যেন তাদের সাথে একমত হতে হবে। সরকারের তৎপরতায় মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের সমস্যাগুলো রাজনৈতিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক। তার মানে তারা বোঝাতে চাইছিল যে, দেশে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য শুধু সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; এজন্য প্রয়োজন সরকারের কার্যপদ্ধতির সংস্কার। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, জনগণ যদি বিশ্বাস করে যে প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং প্রকৃত অর্থেই তা অন্তর্ভুক্তিমূলক, শুধু তখনই সংস্কার সফল হয়। আর সেখানেই ইউনূস সরকার বেশি ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশের নতুন ‘তিনটি শূন্য’-এর প্রথমটি যদি হয় ‘শূন্য জবাবদিহি’, তবে দ্বিতীয়টিকে বলা যেতে পারে ‘শূন্য জনআস্থা’। পরিহাসের বিষয় হলো, সেই সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখন জনগণের আস্থাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

বছরের পর বছর রাজনৈতিক সংঘাতের পর বাংলাদেশের অনেক মানুষ একটি শান্তিপর্বের আশা করেছিলেন। জনগণ অন্তহীন সংঘাতচক্রের অবসান চেয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোয় মৌলিক পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা পরিচয় নির্বিশেষে সকলের সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা এমন একটি সরকার চেয়েছিলেন, যে সরকার বিরাজমান সব শত্রুতা বৈরিতার মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে এবং দেশের ভবিষ্যৎকে শান্তির পথে চালিত করতে পারবে। এক কথায় একটি জাতীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করেছিল জনগণ।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে খ্যাতি নিয়ে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা সাধারণত রাজনীতিবিদের থাকে না। কয়েক দশক ধরে তিনি একজন সংস্কারক, উদ্ভাবক এবং সামাজিক অগ্রগতির প্রবক্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেন বলে মনে করা হয়। দেশের অনেক মানুষ তাকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে কাজ করতে সক্ষম এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। জনগণ এমন আস্থাই রাখতে চেয়েছিল।

নির্দ্বিধায় তার ওপর এ আস্থা ছিল এক অসাধারণ সুযোগ। মনে রাখা জরুরি, আস্থা কিন্তু স্থায়ী কিছু নয়। জনগণের এ আস্থাকে অবশ্যই কাজ, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু ঘটলো উল্টো। প্রাথমিকভাবে যারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করেছিলেন, দ্রুতই তারা সরকারের তৎপরতা এবং অগ্রাধিকার সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকলেন। এই সংকটের বড় কারণ ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের পরেও বিরাজমান রাজনৈতিক মেরুকরণ দূর করতে না পারা।

ফলে নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় ঐক্যমত্য ঘটবে, এই প্রত্যাশা পূরণ হলো না জনগণের। দেখা গেলো ড. ইউনূসের সময় রাজনৈতিক বিভাজন সমাজের আরও গভীরে প্রোথিত হলো।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দ্রুতই মবের রাজনীতি শুরু হয়। একের পর এক মব সহিংসতার ঘটনায় যত দ্রুত এ সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে দৃশ্যমানভাবে ক্ষতি করে, তা অন্য কিছুতে ঘটেনি। দেশের মানুষ সর্বত্র একই ধরনের সহিংসতা দেখতে পায়। তারা এসব ঘটনায় স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করে, সংগঠিত গোষ্ঠীরা কোনোপ্রকার আইনের তোয়াক্কা না করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করছে। এসব গোষ্ঠী বেআইনি উপায়ে যা যা করতে চেয়েছে, তাই করতে পেরেছে। বিস্ময়কর হলো, রাষ্ট্র বা সরকার তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ যাই থাক না কেন, দেশের সাধারণ মানুষ এ পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা এটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হিসেবে দেখেছে। মানুষ দেখতে পেয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে রয়েছে, তারা নিজেরাই নিরুপায়। আর যারা মব উসকে দিচ্ছে, আইনকে বুড় আঙুল দেখাচ্ছে, তারাই সকল শক্তির কেন্দ্রে।

যে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেই সরকার কীভাবে এ ধরনের পরিকল্পিত সহিংসতায় নির্লিপ্ত থাকতে পারে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষ দেখে, মব যেসব জায়গায় সফল হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি জায়গায় অন্তর্বর্তী সরকার নিস্ক্রিয়। প্রতিটি মবের ঘটনায় জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি এবং আইনের শাসন প্রয়োগে ধীরগতি। এ অবস্থা ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এসব মবগোষ্ঠীর ক্ষমতার কাছে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মনে রাখা জরুরি, সরকারের ওপর আস্থা মানে নিরপেক্ষভাবে আইন সমুন্নত রাখার ওপর আস্থা রাখা। আর এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও সামর্থ্য গুরুত্বপূর্ণ। যখন জনগণ সরকারের সে অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন গণঅনাস্থা রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে শাসনব্যবস্থার ভিত্তিমূলে ছড়িয়ে পড়ে।

ধারাবাহিকভাবে মব সহিংসতার এ প্রবণতা কমার লক্ষণ দেখা যায় না। উল্টো প্রকাশ্যে এসব সংঘাত-সহিংসতা চলতেই থাকে। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব একে অপরকে লক্ষ করে উত্তপ্ত বাক্যবাণ ছোড়েন। অব্যাহত থাকে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ। দেখা যায়, সরকারের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষপাতিত্ত্বের অভিযোগ। এমন পরিবেশে সরকারের জন্য নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তার কার্যসম্পাদন। অন্তর্বর্তী সরকার নানা দিক থেকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে তা বাড়তে থাকে।

কেউ কেউ সরকারকে ধীরগতির সরকার হিসেবে অভিযোগ তোলে। আবার কেউ কেউ বলেন, সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ। অনেকে বলতেন, সরকার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী দ্বারা অতিরিক্ত প্রভাবিত। আবার এমন অভিযোগও ছিল যে, সরকার জনগণের চাওয়ার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল নয়।

নানা স্তর থেকে আসা সমালোচনাকে ভারসাম্যের ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবে জনমত অনেক সময় ভিন্নভাবে কাজ করে। যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা একনাগাড়ে কোনো সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন সে সমালোচনাগুলো ন্যায্য হোক বা না হোক আস্থা কমতে শুরু করবে, এটাই স্বাভাবিক। জনমত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যেকোনো সরকারের বৈধতা জনমতের ওপরই নির্ভরশীল। জনগণের চাওয়াকে বুঝতে না পারার ব্যর্থতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের এ প্রতিবন্ধকতা আরও বেড়ে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সবচেয়ে ধারাবাহিক সমালোচনাগুলোর একটি ছিল অনিশ্চয়তা নিয়ে। দেশের মানুষ বারবার কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছে। সরকারের রোডম্যাপ কী? নির্বাচনের আগে কোন সংস্কারগুলোকে অপরিহার্য মনে করছে সরকার? কোন সংস্কারগুলো একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া যেতে পারে? সাফল্যের মাপকাঠি কী হবে? এই সরকার কতদিন স্থায়ী হবে? এই প্রশ্নগুলো ছিল খুব স্বাভাবিক। জনগণ স্বভাবতই সরকারের লক্ষ্য এবং মেয়াদের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর সর্বদাই মনে হতো অসংলগ্ন ও অসম্পূর্ণ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের পক্ষ থেকে বার্তাও পরিবর্তিত হয়েছে। তাদের অগ্রাধিকারগুলোও বদলে গেছে। বদলে গেছে প্রত্যাশাও। দেখা যায়, সমাজে বিরাজমান অনিশ্চয়তা-বিশৃঙ্খলার চেয়েও জনমনে জল্পনাকল্পনা বাড়তে শুরু করে সরকারের মেয়াদ নিয়ে। এই সার্বিক অনিশ্চয়তা এমন একটি শূন্যতা তৈরি করে, যা পূরণ করতে রাজনীতিকরা উদগ্রীব ছিলেন। সরকার যখন নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তখন অন্যরা সেই সুযোগ নেয়। জল্পনাকল্পনা সন্দেহ বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে স্বভাবতই জনগণের আলোচনার বিষয়গুলো সুস্পষ্ট তথ্যের পরিবর্তে অনুমান দ্বারা চালিত হতে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে এর ফল বিস্তৃত হয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত।

জনআস্থা শুধু একটি রাজনৈতিক ভিত্তি নয়। অর্থনৈতিকও বটে। বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা খুঁজতে থাকে এবং এর ভিত্তিতেই তারা সিদ্ধান্ত নেন। পরিস্থিতি স্থিতিশীল বলে মনে হলেই কেবল তারা ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন। এটা স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা না থাকলে উদ্যোক্তারা পুঁজি বিনিয়োগ করেন না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়টাতে তাই অনেক ব্যবসায়িক নেতা সতর্ক ও সন্ত্রস্ত থাকেন। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় তারা এগোয়নি। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন।

কোম্পানিগুলো প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে তারল্য সংরক্ষণে মনোযোগী হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থেকে ব্যবসায়ীরা বিরত থেকেছে। অনেকেই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গতিপথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য করতে থাকে অপেক্ষা।

সংকটকালে ব্যবসায়ীদের এ প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়। বিশ্বজুড়েই লক্ষ্য করা যায়। সব জায়গায়ই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কালে বিনিয়োগগতি কমে যায়। বেসরকারি খাত সবসময় পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেয়। পূর্বাভাস খারাপ বা অনিশ্চিত হলে সতর্কতা অবলম্বন করাই যৌক্তিক। বিনিয়োগের ধীরগতির প্রভাব খোদ সরকার কাঠামোর ভেতরেও অনুভূত হয়।

এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনিশ্চয়তাপূর্ণ পরিবেশে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়াও ধীরে ধীরে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। যে কর্মকর্তারা সাধারণত প্রকল্প অনুমোদন করতেন কিংবা গতানুগতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতেন, তারা দায়িত্ব পালন করতে সচ্ছন্দ বোধ করতেন না। যে কোনো ফাইল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হতো। ফাইল অনুমোদনে দেখা দিলো ধীরগতি। যে বিষয়গুলো একসময় নিম্নস্তরেই সমাধান করা যেত, সেগুলোর জন্য ক্রমশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন পড়ল। এক ধরনের অতিসতর্কতামূলক পরিবেশের উদ্ভব ঘটল। কর্মকর্তারা এ সতর্কতা কেন অবলম্বন করলেন, তা সহজেই বোধগম্য। তারা ভাবলেন, এমন অস্থির ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো ভুল করে বসলে তারা পেশাগত ক্ষতির শিকার হতে পারেন। কিন্তু এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ। এর ফলে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়। প্রকল্পগুলোতে আসে ধীরগতি। পিছিয়ে পড়ছিল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। নিয়মিত কাজ হয়ে উঠছিল কষ্টসাধ্য। যেসব সরকারি কাজের জন্য দ্রুত উদ্যোগ দরকার, বিরাজমান অনিশ্চত পরিবেশে সেসব ক্রমেই গতি হারিয়েছিল। অনেক পর্যবেক্ষক তখন এই স্থবিরতার কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে—সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে তা স্থগিত রাখা হচ্ছিল; দায়িত্ব গ্রণের পরিবর্তে আরেক হাতে পাঠানো হচ্ছিল। অর্থাৎ পদ্ধতিগত সতর্কতার কাছে কাজটাই আসলে হয়ে পড়ছিল গৌণ। এটা বাস্তবতা যে, আত্মবিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে। আত্মবিশ্বাস কমে গেলে মানুষ সংশয়ে পড়ে। আর এই সংশয় বিনিয়োগ, প্রশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও আস্থার সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। সংস্কার আপনাআপনি হয় না। কমিশন গঠন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। সুপারিশ প্রণয়ন করা সে তুলনায় কঠিন। আর সে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন। তাই সংস্কার সফল করতে হলে জনগণের সম্মতি অনিবার্য। জনগণকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, তারা নিষ্ক্রিয় দর্শক নন। তারা এ প্রক্রিয়ার অংশ। রাজনৈতিক অংশীজনদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে, তাদের কথাও শোনা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সংস্কারকে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় না দেখে। প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বুঝতে পারে যে, প্রক্রিয়া বৈধ। মজার ব্যাপার হলো, এখানেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারকর্মসূচি ভয়ানকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক সংস্কার উদ্যোগ এক্ষেত্রে একটি কার্যকর উদাহরণ। মনে রাখা জরুরি, সাংবিধানিক প্রশ্নগুলো শুধু টেকনিক্যাল বিষয় নয়। এ প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠন এবং সে ক্ষমতা প্রয়োগের মৌলিক সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত। ফলে এ ধরনের সংস্কার যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিকশিত হয় সেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের কারণে বৈধতা লাভ করে।

প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন তাই দায়িত্ব, কর্তৃত্ব এবং জবাবদিহিকে প্রভাবিত করে। এমনকি সুপরিকল্পিত সংস্কারও প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে পারে যদি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা মনে করেন যে, তাদের প্রয়োজনীয় আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচনী সংস্কার উদ্যোগ সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হবে। কারণ নির্বাচনী নিয়মনীতির বৈধতা অনেকাংশে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। টেকনিক্যালি সঠিক একটি প্রস্তাবও ব্যর্থ হতে পারে যদি মূল অংশীজনরা প্রক্রিয়াটিকে পক্ষপাতদুষ্ট বা বর্জন করার মতো মনে করেন। এসব কিন্তু সংস্কারের বিরুদ্ধের যুক্তি নয়। বরং, অর্থবহ সংস্কার অনেক সময় অতিপ্রয়োজনীয়। শিক্ষা নিতে হবে এভাবে যে, সংস্কার ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাপ্রক্রিয়া কিন্তু মূল লক্ষ্যের সঙ্গে বিরোধিতা করা নয়। কারণ তারা একে অপরের পরিপূরক।

ঐকমত্য ছাড়া সংস্কার ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ছাড়া সংস্কার বিতর্কিত হয়ে ওঠে। জনআস্থা ছাড়া সংস্কারকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে একটি বৃহত্তর সত্য সামনে এনেছে। সেটা হচ্ছে, জনআস্থা একটি সরকারের সবচেয়ে মূল্যবান রাজনৈতিক পুঁজি, যেখানে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

মনে রাখতে হবে, সরকার সমালোচনা সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। নীতিগত ব্যর্থতা থেকেও রক্ষা পেতে পারে। তুমুল বিতর্ক-বাদানুবাদ তাদের বাঁচতে পারে। কিন্তু আস্থা কমতে শুরু করলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। জনগণ সরকারের উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করলে পরবর্তীতে সব সিদ্ধান্তকে টিকিয়ে রাখা তার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের প্রত্যেকটি সংস্কার উদ্যোগ আরও বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রতিটি উদ্যোগই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। আস্থা কিন্তু সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে।

সরকারের প্রতি আস্থা বেশি থাকলে জনগণ অনিশ্চয়তাও সহ্য করতে আগ্রহী। কারণ তারা বিশ্বাস করে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে। আর আস্থা কমে গেলে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তগুলোকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এই বাস্তবতা কিন্তু ড. ইউনূস জানতেন। কারণ তার কর্মজীবন জুড়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আস্থার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তার সামাজিক উদ্যোগগুলো আস্থার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। আর্থিক ব্যবস্থাগুলো আস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে তিনি ভুলে গেলেন সরকারের টিকে থাকার সূত্রও ওই আস্থাই।

কোনো সংস্কার কমিশন আস্থা তৈরি করতে পারে না। কোনো সাংবিধানিক সংশোধনী আইন করে আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। কোনো প্রশাসনিক অধ্যাদেশ বৈধতা সৃষ্টি করতে পারে না। এসব স্বচ্ছতা, দৃঢ়তা, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক তৎপরতার মাধ্যমেই অর্জন করতে হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় ছিল মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবিধানিক কিংবা প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়। তাই দেশে বিরাজিত গভীর অনিশ্চয়তা ও টালমাটাল সময়ে উচ্চাভিলাষী সংস্কার সাধনের জন্য জনগণের আস্থা বজায় রাখাই ছিল সরকারের বড় দায়িত্ব। যে কোনো সরকারের জন্যেই এ চ্যালেঞ্জ থাকে। ফলে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আইন পরিবর্তন করা নয়, বরং জনগণের আস্থা অর্জন করা।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাসির-তামিমার ভাগ্য নির্ধারণ আজ, দোষ প্রমাণিত হলেই ভয়ঙ্কর পরিণতি

‘ফিল্মি স্টাইলে’ হামলা চালিয়ে পুলিশের হাত থেকে আসামি ছিনতাই

অবশেষে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা-দাফনের সময় জানাল ইরান

বিশ্বকাপের আগেই সুসংবাদ / নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির বার্তা

মাঝ আকাশে বিমানের জানালার কাচ ভাঙলেন যাত্রী!

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

১০

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

১১

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১২

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

১৩

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

১৪

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১৫

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১৬

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১৭

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৮

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৯

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

২০
X