আহমাদ শামীম
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বাঁ পায়ের খেল

বাঁ পায়ের খেল

বিশ্বকাপের এ মৌসুমে প্রিয় দলের তারকা খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সে যারপরনাই খুশি সমর্থকরা। আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসি, মিশরের ফারাও রাজা মোহামেদ সালাহ, নরওয়ের ভাইকিং আরলিং হলাল্ড কিংবা স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালের কথাই যদি ধরি—দলের প্রয়োজনে সব তারকাই এবার বিশ্বকাপের মাঠে জ্বলে উঠেছেন। গোল তো করেছেনই, সেইসঙ্গে দলের প্রাণভোমরাও তারা। মেসির বাঁ পায়ের নিখুঁত কার্লিং শট, সালাহর ক্ষিপ্র গতির ড্রিবল, বল নিয়ে হলান্ডের তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে যাওয়া, আর ইয়ামালের দুর্দান্ত বল নিয়ন্ত্রণ আর গোলমুখে নিখুঁত পাস—সবকিছুরই দেখা মিলেছে এবার। জাতীয়তা ভিন্ন হলেও এসব তারকার সবাই মিলেছেন এক সূত্রে। তারা সবাই বাঁ পায়ের খেলোয়াড়। বাঁ পায়ের ঝলকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন তারা গোটা বিশ্বকে। এই চারজনের বাইরেও এবার বাঁ পায়ের ঝলক দেখাচ্ছেন যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা, ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ বাঁ পায়ের। অথচ আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই হার ২৩ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত। প্রশ্ন হলো, ফুটবলে বাঁ পায়ের খেলোয়াড়দের কেন এত জয়জয়কার।

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে বলতে হয়—মূলত ফুটবলে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের অবস্থান এবং দক্ষতা দলের কৌশলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাঁ প্রান্তে খেলতে হলে বাঁ পায়ের খেলোয়াড়রা বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। সতীর্থের কাছ থেকে পাস পাওয়া বা ক্রস দেওয়ার সময় তাদের অতিরিক্ত শরীর ঘোরাতে হয় না। ফলে তাদের পক্ষে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ওয়ান টাচে খেলা সম্ভব হয়।

একজন বাঁ পায়ের খেলোয়াড় বাঁ দিক থেকে আক্রমণ গড়ে তুললে প্রতিপক্ষের জন্য বল কেড়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ বলটি আক্রমণে আসা খেলোয়াড়ের শরীরের এমন অবস্থানে থাকে, যেখানে প্রতিপক্ষ সহজে ট্যাকল করতে পারে না।

এ ছাড়াও আরেকটি বিষয় না বললেই নয়—আধুনিক ফুটবলের জনপ্রিয় একটি কৌশল হলো ‘ইনভার্টেড উইঙ্গার’ ব্যবহার। অর্থাৎ বাঁ পায়ের খেলোয়াড়কে ডান প্রান্তে এবং ডান-পায়ের খেলোয়াড়কে বাঁ প্রান্তে খেলানো। এই ভূমিকায় লিওনেল মেসির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ডান দিক থেকে বল নিয়ে ডি-বক্সের ভেতর ঢুকে গোলমুখে তিনি নিজের শক্তিশালী বাঁ পায়ে শট নেওয়া কিংবা সতীর্থকে দিতে পারেন নিখুঁত পাস।

আরেকটি বিষয় হলো—ফুটবল মাঠে ডিফেন্ডার বা মিডফিল্ডররা প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের মুভমেন্ট, শরীরের ভঙ্গি এবং বল নিয়ন্ত্রণের ধরন দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাঁ পায়ের খেলোয়াড়দের শারীরিক মুভমেন্ট ও বলের নিয়ন্ত্রণ অন্যদের চেয়ে আলাদা হওয়ায় অনেক সময় প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত হন। তাদের এক মুহূর্তের বিভ্রান্তি, দ্বিধা কিংবা হিসাবের ভুলই কিন্তু ম্যাচের ফল নির্ধারণে সহায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষত বিশ্বকাপের মতো হাইভোল্টেজ প্রতিযোগিতায় এমন ছোট ছোট পার্থক্যই জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে ওঠে।

এবারের বিশ্বকাপে বাঁ পায়ের তারকাদের খেলার মূল্যায়ণে আসা যাক। সবার আগেই আসবে আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির কথা। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন মেসি ৩৯ বছর বয়সে। এ বয়সেও তিনি প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে প্রতিভা, অভিজ্ঞতা ও খেলার বুদ্ধিমত্তা কখনো বয়সের কাছে হার মানে না। ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্সকে এখন পর্যন্ত শুধু সফল বললে কম বলা হবে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে মেসি বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেন। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও করেন জোড়া গোল। প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচ গোলের সুবাদে মেসি জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছেলেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ (১৮ গোল) গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। এ ছাড়াও মাঠে তার উপস্থিতি দলকে যেমন উজ্জীবিত করছে তেমনি তার নেতৃত্বগুণেও আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার।

এরপর মোহামেদ সালাহর কথায় আসা যাক। এবারের বিশ্বকাপে সালাহ শুধু মিশরের সেরা খেলোয়াড়ই নন; বরং পুরো দলের প্রাণভোমরা। তার পারফরম্যান্সকে কেবল গোল বা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা হবে বোকামি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে সালাহ একটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করেন। প্রথমে দলটি ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-১ ব্যবধানে জয় পায়। এই জয় ছিল মিশরের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম জয়, যা ৯২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায়। সালাহ ছিলেন এই ঐতিহাসিক জয়ের প্রধান চরিত্র।

এবার আর্লিং হলান্ডের পালা। নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে তিনি এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন কেন তাকে সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। প্রথম দুই ম্যাচেই চার গোল করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষ সারিতে রয়েছেন। ইরাকের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হলান্ড জোড়া গোল করে নরওয়েকে ৪-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ের জন্য এটি অবিস্মরণীয় বই কিছু নয়। দ্বিতীয় ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষেও হলান্ড ফের জোড়া গোল করে দলকে জিতিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেন। শুধু গোলই নয়, দুই ম্যাচেই তার উপস্থিতি ছিল প্রভাববিস্তারী। সবচেয়ে বেশি শট, সবচেয়ে বেশি বক্সে বল স্পর্শ এবং আক্রমণভাগে অনবরত চাপ সৃষ্টি করে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে দম ফেলার ফুরসত দেননি।

সবশেষে আসি লামিনে ইয়ামাল প্রসঙ্গে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে খেলছেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে এসেছিলেন হালকা ইনজুরির সমস্যা নিয়ে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাই একাদশে ছিলেন না। অসংখ্য আক্রমণের পরও যখন গোলের দেখা পাচ্ছিল না স্পেন, তখন শেষ দিকে মাঠে নামলেও করতে পারেননি তেমন কিছু। স্পেনও গোলশূন্য ড্র করে। কিন্তু সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের দ্বিতীয় ম্যাচে ইয়ামালের প্রত্যাবর্তন যেন পুরো দলের চেহারাই বদলে দেয়। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটে গোল করে তিনি স্পেনকে এগিয়ে দেন এবং শেষ পর্যন্ত স্পেন ৪-০ গোলের বড় জয় পায়। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচেই গোল করে তিনি ইতিহাসের কনিষ্ঠ গোলদাতাদের তালিকায় পেলে ও মেসির পাশে জায়গা করে নিয়েছেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পাগলা মসজিদে এবার মিলল ৪৩ বস্তা টাকা, চলছে গণনা

দুই গোলে এগিয়ে বেলজিয়াম, চাপে পড়ল নিউজিল্যান্ড

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিখোঁজ ৫১ হাজারের বেশি, খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন স্বজনরা

২৭ জুন / আজকের নামাজের সময়সূচি

রূপকথার জন্ম দিল ‘ব্লু শার্কস’ খ্যাত কেপ ভার্দে, ফুটবল বিশ্বে তোলপাড়

শুরুতেই ইরানের জালে গোল দিয়ে এগিয়ে গেলো মিসর

নকআউটে কেপ ভার্দে, সহজ প্রতিপক্ষ পেল আর্জেন্টিনা

সকাল থেকে দেশের যেসব এলাকায় ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না

রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে ১৬০ জন করে যুদ্ধবন্দি বিনিময়

মুসলেরার এক ভুলেই শেষ উরুগুয়ের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে স্পেন

১০

নির্যাতনে গৃহবধূর মৃত্যু, লাশ মর্গে রেখে পালালেন স্বামী

১১

বিশ্বকাপ অভিষেকেই ইতিহাস, নকআউটে কেপ ভার্দে

১২

রাজধানীতে আজ কোথায় কী

১৩

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী ২ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০

১৪

দুপুরের মধ্যে ৬ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে সতর্কসংকেত

১৫

মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি ইরানের

১৬

যুবলীগ নেতার ‘হাত কাটার’ প্রতিশোধ নিতে যুবককে হত্যা

১৭

২৭ জুন / ইতিহাসে এই দিনে আলোচিত যত ঘটনা

১৮

বিশ্বকাপের মাঝেই মেসিপ্রেমীদের জন্য বড় দুঃসংবাদ

১৯

পাশাপাশি কবরে চিরঘুমে লক্ষ্মীপুরের মা-মেয়েরা

২০
X