প্রাধান্য পাচ্ছে নারী অধিকার কর্মসংস্থান ও শিক্ষানীতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার প্রকাশ করতে যাচ্ছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ইশতেহারের মূল মটো নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সুশাসন, সংস্কার, সার্বভৌমত্ব’। ইশতেহারে জাতীয় শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নারী অধিকার, কর্মসংস্থান এবং জুলাই চেতনার বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ পাচ্ছে।
আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর হোটেল লেকশোর গ্র্যান্ডের লা ভিটা হলে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের কল্যাণে দলটির ভাবনা, লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে বলে বলে জানিয়েছেন এনসিপির নির্বাচনী মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহবুব আলম। কালবেলাকে তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করবেন এনসিপি আহ্বয়ক নাহিদ ইসলাম। এবার এনসিপি তারুণ্যনির্ভর ইশতেহার দেবে। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকবে। তা ছাড়া, শিক্ষানীতি, কর্মসংস্থান, নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকারে জোর দিচ্ছে এনসিপি।
দল সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘৩৬ জুলাইয়ের’ সম্মানে ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি। ইশতেহার বিষয়ক উপকমিটিতে প্রধান এহতেশাম হক এবং সেক্রেটারি ইশতিয়াক আকিবের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে এই ইশতেহার। কমিটি সূত্রে জানা যায়, নতুন বাংলাদেশ গঠনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত আগস্টে ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়ন; জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি; বিচার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারসহ ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছিল এনসিপি। সেই ২৪ দফার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নতুন করে পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও সময়োপযোগী করে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান দলটির নেতারা।
ইশতেহার বিষয়ক উপকমিটির প্রধান এহতেশাম হক বলেন, ইশতেহারের ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, তরুণ নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র সংস্কারকে প্রধান্য থাকবে। এনসিপি বিশ্বাস করে—তরুণদের ভবিষ্যৎ শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, কাঠামোগত সংস্কার দিয়েই নিশ্চিত করতে হবে। তাই জুলাইয়ের গণহত্যাসহ সব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, ১৬ বছর বয়সে ভোটাধিকার, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করাই আমাদের তরুণ্য ও মর্যাদার রাজনীতির ভিত্তি।’
ইশতেহার উপকমিটির সদস্যরা জানান, তাদের ইশতেহারে শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে ধরে বরাদ্দ বাড়িয়ে দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির অঙ্গীকার রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করা, গবেষণামুখী উচ্চশিক্ষা, সব ধারার শিক্ষার সমন্বয় ও আধুনিক জাতীয় পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হবে। কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত, শিক্ষকদের মর্যাদা ও পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারে আরও যা থাকছে—
কর্মসংস্থান: দেশে প্রায় ৩০ লাখ বেকারের বড় অংশ তরুণ—এ বাস্তবতায় মর্যাদাপূর্ণ দেশি-বিদেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি দলটির প্রধান লক্ষ্য। রপ্তানিমুখী শ্রমঘন শিল্পের বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষাজীবনে বেতনভুক্ত ইন্টার্নশিপ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রেডভিত্তিক সমন্বিত পরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর অঙ্গীকার রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সিং-রিমোট ওয়ার্কে সহায়ক পরিবেশ, জেলা পর্যায়ে হাব, পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হবে। আইটি, স্বাস্থ্য, নার্সিং, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সনদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক খাত: সামাজিক সুরক্ষা ভাতাগুলোকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা, পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ন্যায্য কর সংস্কারে বৈষম্য হ্রাস ও সুষম উন্নয়ন, মধ্যম আয়ের ফাঁদ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত শক্তিশালীকরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, ঋণখেলাপি রোধে একক ক্রেডিট আইডি ও জাতীয় ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার সংস্কার ও এসইসি পুনর্গঠনের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী অধিকার: নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়ে এনসিপির ইশতেহারে নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জোরদারে নিম্নকক্ষে ১০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নারী নির্বাচনসহ কাঠামোগত সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার বাস্তবায়ন, নিয়োগ-পদোন্নতি-বেতনে লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ এবং গৃহিণীদের অবদানকে জিডিপিতে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। নারী সহিংসতা রোধে প্রতিটি থানায় বিশেষ সেল, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুবিধা ও কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। মাতৃত্ব-পিতৃত্বকালীন ছুটি, চাইল্ড কেয়ার ও বয়স্ক সেবায় প্রণোদনা, নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসামগ্রীর প্রাপ্যতা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নারীদের জন্য বৃত্তি চালুর লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দুর্নীতি দমন ও আমলাতন্ত্র: সেবামুখী প্রশাসন ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে এনসিপির ইশতেহারে সব ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার কথা বলা হবে। ইশতেহার কমিটির সদস্যরা জানান, আমলাতন্ত্রকে সুদক্ষ ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা উন্নত প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন খাতের যোগ্য ও বিশেষজ্ঞদের সরকারে অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করব। নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড। সরকারি কর্ম কমিশনের সব প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা, নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে যথাযথ নিয়োগ-কাঠামো তৈরি করব। সরকারি সেবায় কাগজ, সময় এবং সশরীর উপস্থিতির প্রয়োজন কমিয়ে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স চালুর প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দেব। রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মচ্ছব, বিচারহীনতা ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে আমরা যে কোনো দুর্নীতির দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করব।
১২ ঘণ্টা আগে