বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
মো. মিজানুর রহমান দয়াল
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
স্মৃতিতে জুলাই

গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলে, ‘জ্বালাইয়া দিছোস দেশটা, এবার বুঝবি মজা!’

গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলে, ‘জ্বালাইয়া দিছোস দেশটা, এবার বুঝবি মজা!’

‘তোরে খুঁইজা বাইর করতে অনেক কষ্ট হইছে। জ্বালাইয়া দিছোস দেশটা, এবার বুঝবি মজা!’ চোখ বাঁধা। দুই হাত শক্ত করে বাঁধা। ডিবি পুলিশের একটি মাইক্রোবাসের ভেতরে বসে এই কথাগুলো শুনছিলাম আমি। কয়েক ঘণ্টা আগেও নিজের বাসায় ছিলাম। রাত সাড়ে চারটার দিকে দরজায় প্রচণ্ড আঘাতের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখি, পাঁচটি গাড়ি আমার বাসা ঘিরে রেখেছে।

দরজা না খোলায় সেটি ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শটগানের নল বুকে ঠেকিয়ে আমাকে নিচে নামানো হয়। চোখে কাপড় বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা আমাকে বেড়িবাঁধের বিভিন্ন সড়কে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একজন এসআই বারবার একই কথা বলছিলেন—‘তোরে খুঁইজা বাইর করতে অনেক কষ্ট হইছে। জ্বালাইয়া দিছোস দেশটা, এবার বুঝবি মজা!’

গাড়ির ভেতরে বসেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল গত কয়েক দিনের প্রতিটি ঘটনা। মনে হচ্ছিল, মাত্র চার দিন আগেও আমি ছিলাম রাজপথে—হাজারো শিক্ষার্থীর ভিড়ে, স্লোগানের মধ্যে, উত্তপ্ত এক সময়ের সাক্ষী হয়ে।

১৫ জুলাই আমি প্রথম থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম। তাদের দাবিকে আমি ন্যায্য মনে করেছিলাম। শুধু সমর্থন জানিয়েই থেমে থাকিনি; আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য স্যালাইন, ঠান্ডা পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করেছি। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মুখগুলো দেখে মনে হয়েছিল, এ লড়াইয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোই আমার দায়িত্ব।

পরদিন, ১৬ জুলাই, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নয়াপল্টনে ছাত্রদলের প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষে খবর এল, সাইন্সল্যাব এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চলছে। আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি। ছুটে যাই সেখানে। চারদিকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, বিস্ফোরণের শব্দ, আতঙ্ক। আমি এবং ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু সেদিন কেউ পিছিয়ে যেতে চাইনি।

সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলতেই দেখি চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামের মৃত্যুর খবর। তাঁর ছবি আর শেষ পোস্ট আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মনে হয়েছিল, আন্দোলন তখন আর কেবল একটি দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সেদিন রাতেই আবার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি।

১৭ জুলাই শহীদদের গায়েবানা জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। হাতে ছিল প্রতীকী কফিন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ শুরু হয়। আহতদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আশ্রয় নিই। কিন্তু সেখানেও নিরাপত্তা ছিল না। পরে সেখান থেকে সরে গিয়ে এক বন্ধুর বাসায় রাত কাটাই।

১৮ জুলাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। ধানমন্ডি হয়ে পরে মোহাম্মদপুর-বসিলা এলাকায় অবস্থান নিই। আমার সামনে সহযোদ্ধারা আহত হচ্ছিলেন। হাবিবসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। কিছুক্ষণ পর আমার চোখের সামনেই প্রায় ১০-১১ বছরের এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। আমরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে আর বাঁচেনি। সেই দৃশ্য আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে।

ইন্টারনেট বন্ধ। ফোন ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। বিভিন্ন দিক থেকে সাহস জোগানো হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যাই ঘটুক, রাজপথ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সেদিন মোহাম্মদপুর-বসিলা এলাকায় স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি। ফুটপাতের টিন দিয়ে ঢাল, লোহার পাইপ দিয়ে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা—যা সম্ভব ছিল, তাই করেছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে। অসংখ্য মানুষ আহত হন। আমিও আহত হয়েছিলাম, যদিও তা ছিল তুলনামূলক কম।

সেই রাতেই বাসায় ফিরে ভেবেছিলাম, হয়তো কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হব। কিন্তু আর তা হয়নি।

১৯ জুলাই ভোরে আমার বাসা ঘিরে ফেলে ডিবি পুলিশ। এরপর শুরু হয় আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। আটক করে নিয়ে যায় ডিবি কার্যালয়ে। ডিবি প্রধান হারুন নিজেই কিছু সময় আমাকে নিয়ে একজন ফুটবলারের ফুটবল খেলে, নির্যাতন করে। কিছু সময় পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্যদের কাছে রেখে যায়। সেসময় আমার হাত-পা বেঁধে নিতম্ব ও পিঠে চলতে থাকে নির্যাতন। ২১ জুলাই আমাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, রিমান্ডে নেয়া হয়। ১৯ ও ২০ জুলাই আমাকে গুম করে রাখা হয়েছিল।

রিমান্ডের দিনগুলো ছিল অসহনীয়। ডিবি হেফাজতে থাকাকালে একদিন একটি কিশোরকে আমাদের কক্ষে আনা হয়। তার বয়স হবে ১৬ বা ১৭ বছর। আতঙ্কে ছেলেটির মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। নিজের কষ্ট ভুলে তাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করি। খেতে দিই, কথা বলি, যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। বন্দিদশার মধ্যেও সেই মানবিক মুহূর্তগুলো আমাকে নতুন করে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।

পরে আমাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দিজীবনের প্রতিটি দিন ছিল দীর্ঘ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। তবে কিছু মানুষের আন্তরিকতা আমাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। অবশেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট রাতে আমি মুক্তি পাই। কারাগারের ফটক পেরিয়ে মুক্ত বাতাসে প্রথম নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুভূতি আজও ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না।

আজও যখন জুলাইয়ের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন শুধু রাজপথ, সংঘর্ষ কিংবা গ্রেপ্তারের স্মৃতি নয়; মনে পড়ে অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মুখ। কেউ পানি এগিয়ে দিয়েছেন, কেউ আহতকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

জুলাই আমার কাছে কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়। এটি সাহস, ত্যাগ, ভয়, বেদনা, বন্ধুত্ব, মানবিকতা এবং বেঁচে ফেরার এক অনিবার্য স্মৃতি। ইতিহাস এই সময়কে যেভাবেই মূল্যায়ন করুক না কেন, আমার জীবনের পাতায় জুলাই চিরকাল রয়ে যাবে এক রক্তাক্ত, কিন্তু অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (কেন্দ্রীয় সংসদ)

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিএসইসি’র প্রধান কার্যালয়ে শিল্প সচিবের সৌজন্য ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

রাজধানীতে সন্ত্রাসী হামলায় বিএনপি নেতা নিহত

সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রদলের ফল উৎসব

৩৩টি বিয়ে নিবন্ধনে স্বাক্ষরে অনিয়ম, কাজীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতের নির্দেশ

প্রতারণা মামলায় এসএমপির সহকারী কমিশনার কারাগারে

শাসরুদ্ধকর ম্যাচে ইংল্যান্ডের জয়

শিবির নেতা হত্যার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

আসছে টানা ৪ দিনের ছুটির সুযোগ

পুলিশকে ‘ইট দিয়ে আঘাত করে’ আসামি ছিনতাইয়ের অভিযোগ

ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চাইলেন ব্যবসায়ীরা

১০

'ভয়ে’ পেনাল্টি নিতে রাজি হননি জার্মানির ৪ ফুটবলার

১১

টানলেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

১২

শেখ হা‌সিনাকে ফেরানোর অগ্রগ‌তি নিয়ে যে তথ্য জানালেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

১৩

পরশুরামে মানসিক ভারসাম্যহীন বাংলাদেশিকে ফেরত দিয়েছে বিএসএফ

১৪

৩০০ কোটি বাজেটের সিনেমায় রণবীর সিং, সেপ্টেম্বরে শুরু শুটিং

১৫

জিম্বাবুয়ের কাছে ‘লজ্জার হারে’ পাকিস্তানের নিচে নেমে গেল বাংলাদেশ

১৬

‘আলি খামেনিসহ ইরানিদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে’

১৭

‘আইনের হাত পৌঁছাবে না’ এমন ধারণা ভেঙেছে দুদক: খালেদ রহীম

১৮

ঢাকা-১৫ আসনে সমস্যা একরাশ: সমাধানে একমঞ্চে সরকারি ও বিরোধীদল

১৯

৭ মিনিটেই ইংল্যান্ডের জালে গোল করে চমকে দিল কঙ্গো

২০
X