

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আজকের বৈঠক ঘিরে সারা বিশ্বের নজর এখন বেইজিংয়ের দিকে। বিশ্বের দুই সুপারপাওয়া দেশের দুই শীর্ষ নেতা এমন একসময়ে মুখোমুখি হচ্ছেন, যখন বিশ্ব রাজনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি এ সফরকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বেইজিং পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আজ বৃহস্পতি ও শুক্রবার তিনি শির সঙ্গে একাধিক ফোরামের বৈঠকে অংশ নেবেন।
এটি ২০১৭ সালের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। তবে গত কয়েক বছরে বিশ্ব পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিরল খনিজসম্পদ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে উত্তেজনা বেড়েছে। একই সঙ্গে চীন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী এবং আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে।
ট্রাম্প এমন একসময়ে চীন সফরে গেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে আছে। যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প আশা করেছিলেন দ্রুত সমাধান হবে, কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও শান্তি চুক্তি হয়নি। ফলে এ বৈঠকে ইরান ইস্যু বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। তাই যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন ইরানকে চাপ দিক, যাতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং যুদ্ধের সমাধান হয়। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করবেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে, চীন ইরানকে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে পারে। যদিও বেইজিং এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তাইওয়ান ইস্যুও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে। শি জিনপিং চাইতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি কমায়।
বাণিজ্যও দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাম্প প্রশাসন ও চীন নতুন কিছু বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কৃষি, জ্বালানি ও বিমান খাত নিয়ে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নেতারাও এ সফরে অংশ নিচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও আলোচনা হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উন্নত এআই প্রযুক্তি নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এ ছাড়া ট্রাম্প মানবাধিকার ইস্যুও তুলতে পারেন। বিশেষ করে হংকংয়ের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জিমি লাই এবং আটক ধর্মীয় নেতা পাস্টর এজরা জিনের বিষয় তিনি আলোচনা করতে পারেন।
অন্যদিকে চীন মনে করছে, বর্তমানে তাদের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ নিয়ে ব্যস্ত। তাই বেইজিং এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। চীন চায় যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করুক এবং চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে বিভিন্ন কালো তালিকার নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নিক। চীন আরও চাইছে তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রযুক্তি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেশি প্রবেশাধিকার পাক। একই সঙ্গে তারা বিরল খনিজসম্পদের বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বাড়াতে পারে।
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে চীন নিজেদের প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতকে অনেক শক্তিশালী করেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, রোবট প্রযুক্তি এবং এআই খাতে চীন এখন বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাই চীনকে আরও আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করেছে।
শি জিনপিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা, কারণ এতে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও এগোবে। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবহার করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করতে পারেন।
এ বৈঠক শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুই দেশ কিছুটা স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তাহলে সেটিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হবে।