

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার মামলায় রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ হবে আগামী ১৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার। দিনটি ঘিরে ঢাকা ‘লকডাউন’ কর্মসূচি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ‘লকডাউনের’ মূল নেতৃত্ব গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাদের হাতে থাকবে বলে আভাস দিয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। শেখ হাসিনার নিজ জেলার অর্ধশতাধিক নেতাসহ সারা দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতাকর্মীকে এরই মধ্যে চিহ্নিতও করেছেন গোয়েন্দারা। চিহ্নিতদের তালিকা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। লকডাউন কর্মসূচি পালনে কেউ যেন রাস্তায় নামতে না পারে সেজন্য অভিযান আরও জোরদার করবে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে কালবেলাকে।
সূত্র জানায়, যেসব জেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বেশি, সেসব জায়গায় বাড়তি কড়াকড়ি থাকছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শেখ হাসিনার পৈতৃক নিবাস গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের লোকজন এখনো বেপরোয়া। তারা এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ ভন্ডুল করে দলটির নেতাদের অবরুদ্ধ করতেও সক্ষম হয়েছে। গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ শক্তি দেখিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১৩ নভেম্বর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে হওয়া মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ঠিক করা হবে। রায়ের তারিখ ঘোষণার পরপরই গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা বড় পরিসরে সহিংসতা ও বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। জেলাটির যেসব এলাকায় বিক্ষোভ কিংবা সহিংসতা হতে পারে সেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। এ জেলায় যারা সহিংসতা চালানোর দায়িত্বে থাকবেন, তাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন।
একাধিক জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কালবেলাকে জানিয়েছেন, ১৩ তারিখ ঘিরে তাদের নিজ নিজ জেলায় বাড়তি সতর্কতা নিতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে তারা জেলার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা রোধে জেলায় সেনাবাহিনী, পুলিশসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা সতর্কতামূলক বাড়তি পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
বিশেষ সভায় কঠোর বার্তা: দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ১৩ তারিখের ‘লকডাউন’ নিয়ে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, কোনো ধরনের নাশকতা চালাতে পারবে না আওয়ামী লীগ। মাঠে নামলেই দলটির নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় আনা হবে। লকডাউনের কর্মসূচিতে কেউ মাঠে নামলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী কয়েক দিন ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক দিনে কয়েকশ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের এ অভিযান সামনে আরও জোরালো হবে। কারণ আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব ধরনের অপতৎপরতা চালাতে চেষ্টা করবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর ও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে গত রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ১৩ নভেম্বর ঢাকা লকডাউন নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। মোতায়েন করা সেনাবাহিনীর ৫০ শতাংশ তুলে নেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, সেনাবাহিনী আগের মতোই মাঠে থাকবে। মাঠ থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করা হবে না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনী মাঠেই থাকবে।
কোর কমিটির বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বিদেশে পালিয়ে থেকে আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির একাধিক নেতা ফেসবুকে ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি নিয়ে যে প্রচার চালাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি জেলা বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল ও গাজীপুর থেকে বেশ কিছু নেতাকর্মী ঢাকায় ঢুকেছেন। তারা ঝটিকা মিছিলগুলোতে অংশ নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণসহ নানা ধরনের নাশকতা চালানোর পরিকল্পনায় অংশ নিচ্ছেন। সুতরাং ঝটিকা মিছিল বের হলেই তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর পুলিশ সদস্যদের আরও সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। রাস্তাঘাটের সিসি ক্যামেরাগুলো যেন সার্বক্ষণিক সচল থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বলা হয়েছে। রাজধানীর বিশেষ বিশেষ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানোর প্রস্তাব দেন বাহিনীর প্রতিনিধিরা, যা গৃহীত হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগের বরিশাল অঞ্চলের দুই নেতার নাম উল্লেখ করে তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। এই দুই নেতা বিদেশে বসে আবারও অতীতের মতো কোনো কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা।
বাড়ছে ধরপাকড় : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভাষ্য, সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ‘গুজবটি’ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই ছড়িয়েছে। কর্মীদের মাঠে নামানোর জন্য তারা এমন ‘গুজব’ ছড়াচ্ছে। তবে এতে কোনো কাজ হবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা মাঠে নামবে না। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে ঢুকে গেছে। যে কারণে তাদের আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে না। তবে নিবেদিতপ্রাণ কিছু কর্মী ‘লকডাউন’ ঘিরে রাস্তায় নামতে পারেন। তাদের অনেকেই এরই মধ্যে রাজধানীতে পৌঁছেছেন। তারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ঝটিকা মিছিলেও অংশ নিচ্ছেন।
গত রোববার রাতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৩৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ থেকে এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ওই বার্তায় ডিএমপি জানায়, রাজধানীতে ঝটিকা মিছিলের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও অংশগ্রহণকারী কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের আরও ৩৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এর আগে ঢাকার আকাশে এক লাখ বেলুন ওড়ানোর পরিকল্পনা করার অভিযোগে ২৫ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আগামী কয়েকদিন গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে বেশ কয়েকটি সূত্র।
রাজপথে থাকবে দলগুলো: আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচির আগে ঝটিকা মিছিল প্রতিহতে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের সহযোগী সংগঠন মাঠে সক্রিয় থাকবে। বিএনপির যুব সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল ঢাকায় এরই মধ্যে মিছিলও করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) আন্দোলনের নামে যে কোনো নাশকতা প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে। আরও পিআর, গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে মাঠে রয়েছে জামায়াত ইসলামী। দলটি দাবি আদায়ে আন্দোলনে থাকলেও আওয়ামী লীগের ‘লকডাউন’ প্রতিহতে সজাগ থাকবে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।