

বিচার বিভাগে মামলাজট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কুফল পড়ছে রাষ্ট্রের সব স্তরে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও। এবার উচ্চ আদালতে মামলা জটের কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষা প্রশাসন। শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি-সংক্রান্ত অধিকাংশ কাজ করতে পারছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। উচ্চ আদালতে মামলা জটের কারণে বছরের পর বছর প্রশাসনিক অনেক সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না মন্ত্রণালয়টি। এ অবস্থায় শিক্ষা প্রশাসনে গতি ফেরাতে শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলাগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সাজিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার সম্পন্ন বেঞ্চকে দায়িত্ব দিতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ৫৫৮টি, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগে মামলা সংখ্যা ১ হাজার ১২০টি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৯১৪টি। এসব মামলার সঙ্গে এক লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির বিষয় জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে আছে ২০১৩ সালে জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ৫০ শতাংশ চাকরিকাল গণনা করে গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়নপূর্বক জ্যেষ্ঠতা প্রদান, প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্কেল প্রাপ্তি এবং নানাবিধ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের দাবি- সংক্রান্ত। ২০১৭ সালে প্রথম এ ধরনের একটি রিট হাইকোর্টে দায়ের হয়। এরপর আরও কয়েকটি রিট হয়। সব রিটের ওপর হাইকোর্ট রায় দেন। ২০২৩ সালে মামলাটি আপিল বিভাগে যায়। সিভিল আপিল নং ৭৩/২০২৩। গত ১৮ জুন এই সিভিল আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। আপিল বিভাগ আগামী ২ জুলাই রায়ের জন্য রেখেছেন। এ মামলার সঙ্গে সাড়ে ৩২ হাজার শিক্ষকের পদোন্নতির বিষয় জড়িত। অন্যদিকে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আপিল মামলাটির রায় হওয়ার পর এসব পদোন্নতি ও শূন্য পদ পূরণের কাজটি চালু করা সম্ভব হবে। রায়টি হলে অনেক বড় একটি জটিলতা কেটে যাবে বলে জানিয়েছেন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।
এদিকে সারা দেশে হাজার হাজার দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ আটকে আছে দীর্ঘদিন। ২০১৯ সালে এক রিট (১২৭৫০/২০১৯) মামলার কারণে হাইকোর্ট নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করেছেন। সেই থেকে মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিধান চ্যালেঞ্জ করে ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট রায় দেন। এরপর আপিল বিভাগে সিভিল আপিল ১৩২৬/২০২০ মামলা হয়। আপিল মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলার কারণে প্রধান শিক্ষকের প্রায় ২ হাজার ৬০০ শূন্য পদে পদোন্নতি প্রদানে জটিলতা তৈরি হয়ে আছে। এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলায় প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ বন্ধ আছে। এ মামলার আপিল নিষ্পত্তি হলে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগে বাধা থাকবে না। মামলাটি নিষ্পত্তি হলে ১০ হাজারের অধিক পদে নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হবে। এভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। বছরের পর বছর এসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের পয়েন্ট অব অর্ডারে করা এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন মামলা জটের কাছে তার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। মন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন মামলা জটিলতার কারণে আমরা শিক্ষক নিয়োগ সমস্যার নিরসন করতে পারছি না। চার মাস হতে চলল এ মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্ব পেয়েছি। প্রথম সপ্তাহ থেকেই আদলত পাড়ায় এ মামলাগুলোর জটিলতা নিরসনে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু, এখন পর্যন্ত আপিল বিভাগের কজ লিস্টে এগুলো আসছে না। ফলে সারা বাংলাদেশেই শিক্ষকের অভাবের কথা সবাই বলছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলা কয়েক টাইপে বিভক্ত করতে হবে। এরপরই এসব একসঙ্গে শুনানি করা সম্ভব। এজন্য হাইকোর্টে সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার সম্পন্ন বেঞ্চ গঠন করতে হবে। প্রধান বিচারপতিকে এই উদ্যোগ নিতে হবে। মন্ত্রণালয়কেও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দ্রুত এসব মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। ব্যারিস্টার মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী।
অধিকাংশ মামলা হচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝি থেকে। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষ ছোট ছোট বিষয়েরও দায়ভার নিতে চায় না। ছোট ছোট বিষয় যেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরই নিরসন করে। তাহলে মামলার সংখ্যা কমে যাবে। পাশাপাশি মামলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তালিকা তৈরি করতে হবে। তারপর সেই তালিকা ধরে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। অ্যাডভোকেট ছিদ্দিকউল্ল্যাহ মিয়া; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
তিনি বলেন, শুধু এই-একটিই নয়, এনটিআরসিতে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ, কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ, সেটিও মামলা জটিলতায় ঝুলে আছে। প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ সেগুলো মামলার কারণে ঝুলে আছে। আমরা মামলার যদি পরিসংখ্যান দেখি তাহলে হাজার হাজার মামলা দেখতে পাচ্ছি। অন্যদিকে সারা দেশে মোট ৫০ হাজার ৯৫৭টি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। যারা প্রধান শিক্ষক হতে পারেননি তারা রিটায়ারমেন্টে চলে যাচ্ছে এবং তারা প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশন পাচ্ছেন না। মামলা জটিলতার কারণে এগুলো নিরসন করা যাচ্ছে না।
জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে যেসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলো মোটামুটি ১০-১২টা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং সহকারী শিক্ষকদের (পঞ্চম শিক্ষকসহ) চাকরি জাতীয়করণের দাবি-সংক্রান্ত। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি; সহকারী শিক্ষক/প্রধান শিক্ষকদের বদলির আদেশ চ্যালেঞ্জ-সংক্রান্ত; সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ ও চাকরিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি-সংক্রান্ত; বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণীত চাকরিবিধি চ্যালেঞ্জ করে বিদ্যমান চাকরিজীবীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির দাবি-সংক্রান্ত; সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চ্যালেঞ্জ-সংক্রান্ত; অনুন্নত/বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় দেড় হাজার বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ প্রকল্প’-এর আওতায় নিয়োজিত সহকারী শিক্ষকদের চাকরিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি-সংক্রান্ত; প্রকল্পভিত্তিক কর্মচারীদের প্রকল্পে যোগদানের তারিখ অথবা রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের তারিখ থেকে চাকরি নিয়মিতকরণের দাবি-সংক্রান্ত; কোটা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জারি করা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি; চ্যালেঞ্জ-সংক্রান্ত; নিম্ন আদালতের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক দায়েরকৃত দেওয়ানি আপিল ও রিভিশন মামলা; সুপ্রিম কোর্টের (উভয় বিভাগ) প্রদত্ত রায় ও আদেশ বাস্তবায়নের জন্য আদালত অবমাননার আবেদন-সংক্রান্ত মামলা।
আইনজীবীরা বলেছেন, মামলাগুলো যে যে টাইপের তা আলাদা করতে হবে। একক টাইপের মামলা একসঙ্গে শুনানি করতে হবে। এজন্য হাইকোর্টে একটি ডেডিকেটেড (সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার সম্পন্ন) বেঞ্চ প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে বিভিন্ন টাইপের মামলাগুলো আলাদা তালিকা আকারে আদালতে সরবরাহ করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এই কাজটি করতে হবে। উভয় পক্ষের প্রচেষ্টাতেই কেবল মামলা জটের কবল থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা যা বলেছেন : জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ২০১৩ সালে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়, তখন স্কুল ও স্কুলের শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ-সংক্রান্ত অনেক মামলা হয়। এ ছাড়া নিজেদের মধ্যে সার্ভিস রিলেটেড মামলা রয়েছে। সারা দেশে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগের মামলা রয়েছে। এসব মামলায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আদালতেরও সময় নষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সাড়ে ৩২ হাজার শিক্ষকের পদোন্নতি-সংক্রান্ত মামলাটি আপিল বিভাগে ৫ বার শুনানির চেষ্টা করা হয়েছে। বেঞ্চ পুনর্গঠনসহ নানা কারণে শুনানি হয়নি। ফলে দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়তে হয়েছে। অবশেষে মামলাটির শুনানি শেষ হয়েছে। আগামী ২ জুলাই রায়ের দিন ধার্য আছে। রায়টি হয়ে গেলে অনেকটা শৃঙ্খলা চলে আসবে। শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলার জট নিরসনে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে যেসব মামলা বিচারাধীন, সেগুলোকে কয়েকটি টাইপে বিভক্ত করা যায়। একেক টাইপের মামলা একসঙ্গে শুনানি করা সম্ভব। কারণ, মামলাগুলো একই প্রকৃতির। এটা করতে হলে মাননীয় প্রধান বিচারপতি মামলার জট নিরসনে হাই কোট ডিভিশনের একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করে দেবার বিষয়ে বিবেচনা করতে পারেন। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়কেও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দ্রুত এসব মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। তখন আর প্রশাসনিক স্তবিরতা তৈরি হবে না।
সুপ্রিম কোর্টে সার্ভিস ম্যাটার নিয়ে বাদীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট ছিদ্দিকউল্ল্যাহ মিয়া কালবেলাকে বলেন, মামলা জট কমাতে হলে মামলাকারী ও রাষ্ট্রপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে সাড়ে ১৩ হাজার মামলা বিচারাধীন থাকলে তার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মামলা গুরুত্বপূর্ণ। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অধিকাংশ মামলা হচ্ছে ভুল বোঝাবুঝি থেকে। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষ ছোট ছোট বিষয়েরও দায়ভার নিতে চায় না। তারা ভুক্তভোগীকে মামলার দিকে ঠেলে দেয়। কর্মকর্তারা বলেন, আপনি মামলা করে আসেন। তারা নিজেরা দায় নিতে চায় না। এই যে ছোট ছোট বিষয়গুলো যেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরই নিরসন করে। তাহলে মামলার সংখ্যা কমে যাবে। পাশাপাশি যেসব মামলা আছে, সেগুলোকে ক্যাটাগরিক্যালি ভাগ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ, অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তালিকা তৈরি করতে হবে। তারপর সেই তালিকা ধরে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য মামলার সব পক্ষকেই ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলেই জট কমে আসছে, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটবে না।