

মাত্র ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত; কিন্তু অত্যন্ত নিবিড় এক কূটনৈতিক সফরে মালয়েশিয়া জয় করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন তিনি। গতকাল সোমবার সফর সমাপ্তি শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৮ ঘণ্টার এ সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে, যা আগামী দিনে দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
মালয়েশিয়ার শাংগ্রি লা হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফরে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে বৈঠক করেন। কুয়ালালামপুরে
পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে তার পরিকল্পনা তুলে ধরেন; দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
মাহদী আমিন জানান, সফরকালে গতকাল দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথমে একান্ত, পরে প্রতিনিধিদল পর্যায়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, শ্রমবাজার, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। ৯টি বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ এবং হালাল পণ্যের সনদ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ জনবল তৈরিতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কম খরচ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির অনুরোধ করেছেন তিনি। দেশটিতে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বা কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের মানবিকভাবে বৈধতা দেওয়া অথবা নিরাপদে দেশে ফেরানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে মালয়েশিয়ার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর: এদিকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা তথা দুই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। এ ছাড়া বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা তথা বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতা জোরদার করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ (ইওএন) বিনিময় করা হয়।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) তথা দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করার জন্য একটি ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) বিনিময় করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো সেরি উতামা হাজি মোহাম্মদ বিন হাজি হাসান নিজ নিজ দেশের পক্ষে দলিল বিনিময় করেন।
আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। গতকাল স্থানীয় সময় দুপুরে পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাসভবনে এ মধ্যাহ্নভোজ হয়। মধ্যাহ্নভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
এরপর ভবনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে মালয়েশিয়ার শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে স্কুলের শিক্ষার্থীরা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ গানটি পরিবেশ করে। দুই প্রধানমন্ত্রীসহ তাদের সহধর্মিণীরা এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান ভবন থেকে নেমে এলে প্রবেশ পথের দুই পাশে মালয়েশিয়ার শিশু-কিশোররা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকা হাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের শুভেচ্ছা জানান।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে থাকা গাড়ির সামনে এসে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার সহধর্মিণী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিনীকে বিদায় জানান।
কুয়ালালামপুরে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার পর গতকাল বিকেলেই মালয়েশিয়ার সফর শেষ করে চীনের ডালিয়ান শহরের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম বার্ষিক সভায় (সামার ডাভোস) যোগ দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, মালয়েশিয়া থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাত্রা শুরু করেছেন। দালিয়ানে দুদিন কর্মব্যস্ত কর্মসূচিতে থাকবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী চীনের রাজধানী বেইজিং যাবেন। সেখানে চীনে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের মূল কর্মসূচি শুরু হবে। দালিয়ানে বিশ্ব আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মালয়েশিয়ার শীর্ষ করপোরেট জায়ান্টের সঙ্গে বৈঠক: ১৮ ঘণ্টার এ ঝটিকা সফরেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চাকাকে গতিশীল করতে হোটেল শাংগ্রি লা-তে মালয়েশিয়ার পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পেট্রোনাস (জ্বালানি খাত, আজিয়াটা (টেলিকমিউনিকেশন), এয়ারএশিয়া (অ্যাভিয়েশন ও পর্যটন), পার্ডুয়া (অটোমোবাইল) এবং এমএমসি পোর্ট (বন্দর ও অবকাঠামো)। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার রোধ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও মালয়েশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।