

আজ ২৩ জুন, মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আইনগতভাবে রাজপথে দলটির কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের আকস্মিক ‘কার্যক্রম’ ঠেকাতে সরকার তৎপর হয়েছে। দলটির সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলসহ নানা তৎপরতার চেষ্টা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ দিনটি ঘিরে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ‘অপতৎপরতা’ ঠেকাতে আজ মাঠে সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং বিরোধী দলগুলোর নানা সংগঠনও রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গতকাল থেকে ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম মহানগর ও গাজীপুর মহানগর এলাকা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় স্পেশাল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রিসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুর, মাদারীপুর, শেরপুর, মৌলভীবাজার ও কক্সবাজার জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তিন মহানগর এলাকা ও তিন জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরবাসীর নিরাপত্তা দিতে এবং যে কোনো ধরনের অপতৎপরতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আজ রাজধানীজুড়ে অন্তত ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া নানা বেশে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা কার্যক্রম চলবে। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে থাকবে বিশেষ চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম।
যদিও গতকাল সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী মোতায়েন রুটিন দায়িত্ব বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা সরকারের গোচরীভূত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় তারা মিছিল বা সমাবেশের মাধ্যমে জনমনে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা যাতে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য দেশের সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যে কোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার লক্ষ্যে ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশকে সহযোগিতা করতে বিজিবি কিংবা সেনাবাহিনী মোতায়েন একটি নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া। গত ১৫ জুন দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন শেষে সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও বর্তমান বিশেষ পরিস্থিতিতে শুধু সুনির্দিষ্ট এলাকায় এ সীমিত মোতায়েন সম্পন্ন করা হয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক প্রজ্ঞাপনে গত বছরের ১২ মে আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকার্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। চলতি বছরের এপ্রিলে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাসের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রমের ওপর থাকা এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্যে দলটির কার্যক্রমের সুযোগ নেই। যদিও অনলাইনে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন নানা সভা-সমাবেশ করে আসছে। মাঝেমধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেও নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে দলটি। অবশ্য আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবাষির্কীর কর্মসূচি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকলেও দলটির পক্ষ থেকে আজ রাজপথে নামার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চোখে পড়েনি। নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে দলটি নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করে আসছে।
গতকাল সন্ধ্যায় বিজিবি সদর দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সন্ধ্যা (সোমবার) থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েনের জন্য বিজিবি সদস্যরা স্ট্যান্ডবাই থাকবেন। বিজিবি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কার্যক্রম ঘিরে রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকেই এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দলটির কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীজুড়ে ২০০টিরও বেশি কৌশলগত স্থানে পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট থাকবে। একই সঙ্গে বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সবকটি প্রবেশপথে কড়া চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার থাকবে। পুলিশের ১৮ হাজার নিয়মিত সদস্যের পাশাপাশি মাঠে ডিএমপির বিশেষায়িত ইউনিট ডিবি, সিটিটিসি ও আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্রের তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিরোধে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে।
ডিএমপির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের চারটি প্রধান কন্ট্রোলরুমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক ফোর্স স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে।
পুলিশের কয়েকটি রেঞ্জ ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিজ নিজ এলাকায় নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন এলাকায় তল্লাশি ও টহল ছাড়াও মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে জোর দেওয়া হয়েছে।