

হিউস্টনের স্টেডিয়ামে তখন উৎকণ্ঠার শেষ মুহূর্ত। সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র শেষে কেপ ভার্দের ফুটবলাররা মাঠেই থেমে গেলেন। হাতে হাতে উঠে এলো মোবাইল ফোন। সবার চোখ স্পেন বনাম উরুগুয়ের ম্যাচের দিকে। স্পেন যদি জেতে, তাহলেই ইতিহাস। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আর থামানো গেল না কাউকে। গ্যালারিতে, মাঠে—সর্বত্র অশ্রু। আনন্দের, গর্বের, অবিশ্বাসের। ফুটবল বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্যই হলো এমন অভাবনীয় রূপকথা; যেখানে পরিসংখ্যান, ইতিহাস কিংবা দেশের আয়তন নয়—মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে বড় চমক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সব মিলিয়ে বলতেই হয়, এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে যা করে দেখিয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে সময়ের অন্যতম বিস্ময়কর এক কীর্তি। আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে থাকা ১০টি দ্বীপের ৫ লাখ ২৫ হাজার মানুষের এ ছোট্ট জাতি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষুদ্র দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে উঠেছে। দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে জন্ম দিয়েছে দারুণ এক রূপকথার। অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর বা অলৌকিক—যে কোনো বিশেষণই হয়তো তাদের এ অর্জনের সামনে ছোট মনে হবে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে ফুটবল বিশ্বকে আক্ষরিক অর্থেই চমকে দিয়েছে আটলান্টিকের নীল হাঙররা। নকআউট পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ ‘জায়ান্ট’ আর্জেন্টিনা। মিয়ামিতে শেষ ৩২-এ লিওনেল মেসিদের মুখোমুখি হবে আফ্রিকার এ ছোট্ট দেশটি। যাদের গ্রুপ পর্বের যাত্রাটাও ছিল রূপকথার মতো। প্রথম ম্যাচেই ২০১০ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা সেদিন সাত-সাতটি শট সেভ করে দলকে বাঁচান। দ্বিতীয় ম্যাচে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র। স্পেনের প্রাক্তন বিশ্বকাপজয়ী হোয়ান মাতা মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য—শুধু স্পেনের বিপক্ষে একটা ম্যাচ নয়, সর্বোচ্চ মঞ্চে পরপর তিনটি ম্যাচ!’ কিন্তু এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছরের পরিকল্পনা ও পরিশ্রম। কেপ ভার্দের ফুটবল ফেডারেশন প্রবাসী খেলোয়াড়দের দলে টেনে আনার একটি সুচিন্তিত কৌশল নিয়েছিল। ২৬ সদস্যের দলের ১৪ জনই জন্মেছেন দেশের বাইরে। ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগালের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সমুদ্রবাণিজ্যের ঐতিহ্যের সুবাদে নেদারল্যান্ডসের রটারডামেও রয়েছে বড় কেপ ভার্দীয় সম্প্রদায়। দলের ছয় খেলোয়াড় সেই বন্দর শহর থেকেই উঠে এসেছেন।
ডাবলিনে জন্ম নেওয়া সেন্টার-ব্যাক রবার্তো লোপেস ২০১৯ সালে লিংকডইনের মাধ্যমে দলে যোগ দেওয়ার কথা এখন ফুটবল বিশ্বে ভাইরাল হয়ে গেছে। নকআউট পর্ব নিশ্চিত হতেই তার কথা, ‘এই দলে একটা অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাস আছে যে, আমরা বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে পারি।’ কোচ বুবিস্তার কথা তো না বললেই নয়, তার নেতৃত্ব এ সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে দায়িত্বে থাকা এ ৫৬ বছর বয়সী সাবেক ডিফেন্ডার দলকে তৈরি করেছেন শৃঙ্খলা, ঐক্য ও মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন তাকে ২০২৫ সালের সেরা কোচ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে কেপ ভার্দে মাত্র একটি ফাউল করেছিল—১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো দলের সর্বনিম্ন।
ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় মিডফিল্ডার ডেরয় ডুয়ার্তে মুগ্ধ বিস্ময়ে বললেন, ‘সত্যি বলতে, পাগলামি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে? কঠিন ম্যাচ; কিন্তু বিশ্বাস রাখি। সবকিছু সম্ভব।’ গ্যারি নেভিল বললেন, বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের সমালোচকরা হয়তো এখন নিজেদের কথা পুনর্বিবেচনা করবেন। কারণ ৫ লাখ মানুষের একটি দেশ যখন উরুগুয়ের মতো শক্তিকে ছাপিয়ে নকআউটে ওঠে, সেটা শুধু ফুটবল নয়—সেটা মানবিক সংগ্রামের জয়গান। তাদের এ স্বপ্নযাত্রা এখানেই থেমে যাবে—এ কথা নিশ্চিত করে বলার সাহসও হয়তো আর কারও নেই।