

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের পি কে রায় রোডের ইস্পাহানি ভবনের সিঁড়ি থেকে রক্তাক্ত এক তরুণ বের হচ্ছিলেন। শরীর থেকে পা বেয়ে বেরিয়ে পড়া রক্তে ভেসে যাচ্ছিল মেঝে। নিজের রক্তেই যেন পিছলে পড়ছিলেন তিনি। গত শুক্রবার রাত থেকে এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে হাতে হাতে মোবাইল ফোনে। সেই দৃশ্যে আঁতকে ওঠে মানুষ।
রাতেই সেই নৃশংসতার তথ্য সামনে আসে হাসপাতালে তরুণটির মৃত্যুর খবরের মধ্য দিয়ে। নিহত যুবকের নাম জাকির হোসেন (৩১)। পেশায় তিনি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
পুলিশ সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডে অন্তত ১২ জন অংশ নেয়। তাদের মধ্যে সরাসরি জড়িত এক তরুণ ও তিন কিশোরকে শুক্রবার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়। আরও অন্তত ৬ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার বিকেলে সূত্রাপুরের বিবিকা রওজা ইমামবাড়া থেকে শুরু হওয়া একটি তাজিয়া মিছিল চকবাজার-লালবাগ হয়ে ধানমন্ডির দিকে যাচ্ছিল। সেটি ইমামবাড়ার অদূরে বাংলাবাজার এলাকায় যেতেই মিছিলে থাকা একদল কিশোর ‘ধর ধর’ করে জাকিরকে ধাওয়া করছিল। একপর্যায়ে তারা ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে ধাওয়া করতে থাকে। এতে মিছিলের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জাকির স্থানীয় ইস্পাহানি ভবনে ঢুকে সিঁড়ি ঘরে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানেই তাকে কোপানো হয়। পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বের হতে দেখা যায়। স্থানীয় লোকজন ওই তরুণকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শুরুতে তার নাম জানা না গেলেও পরে পরিচয় শনাক্ত হয়।
পুলিশ জানায়, তুচ্ছ ঘটনায় এমন হত্যাকাণ্ড হয়েছে। নিহত জাকির ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা একই সঙ্গে তাজিয়া মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলটি শুরুর পর তাজিয়ার ‘ডুলির রশি’ ধরাকে কেন্দ্র করে জাকির ও হামলাকারীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। তা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। এর পরও মিছিলটি চলছিল। একপর্যায়ে হামলাকারীরা জাকিরকে একা পেয়ে ‘ধর ধর’ করে ধাওয়া শুরু করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, হামলাকারীদের প্রায় সবাই বয়সে শিশু-কিশোর। এদের কেউ ছাত্র, আবার কেউ স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞার পরও মিছিলের সময়ে এই গ্রুপটি ধারালো অস্ত্র বহন করেছিল।
তিনি বলেন, ঘটনার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সরাসরি জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনাক্ত হওয়া আরও ৬ জনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গ্রেপ্তার ৪ জনের মধ্যে একজন মো. রাশেদ (২০)। অপর তিনজন শিশু-কিশোর হওয়ায় পুলিশ তাদের নাম প্রকাশ করেনি। তাদের কাছ থেকে একটি সুইচ গিয়ার চাকু, একটি চাপাতি, ঘটনার সময় তাদের পরনে থাকা জামাকাপড় উদ্ধার করার তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, জাকির দৌড়ে ইস্পাহানি ভবনে ঢুকছে। তার আগেই হামলাকারীদের একজন সিঁড়িতে উঠে গেলে তিনি ওপরের দিকে আশ্রয় না নিয়ে সিঁড়ি ঘরে আশ্রয় নেন। এর আগে তাকে অন্তত দুই টেনেহিঁচড়ে ভবনটির নিচে নিয়ে যায়। পেছন থেকে কয়েকজন তাকে কিলঘুসি মারতে থাকে। সিঁড়ি ঘরে ঢুকে গেলে কিছুটা লম্বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা একজন তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একপর্যায়ে পাঞ্জাবিতে রক্তমাখা অবস্থায় ওই হামলাকারীকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।
ভিডিওতে মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যে হামলাকারীদের বের হয়ে যেতে দেখা যায়। পেছনে রক্তাক্ত অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে বের হন জাকির। তখনো তার পা বেয়ে পড়া রক্ত মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছিল।
এর আগে গত বছরের ৯ জুলাই পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কংক্রিটের ব্লকে মাথা থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডে আঁতকে ওঠে মানুষ। সেই নৃশংসতার এক বছরের মধ্যেই পুরান ঢাকায় ফের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল।