হুমায়ূন কবির
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবলের রঙে বিচিত্র পৃথিবী

ফুটবলের রঙে বিচিত্র পৃথিবী

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। চার বছর পরপর যখন বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে, তখন শুধু ৯০ মিনিটের খেলাই হয় না, মাঠের বাইরেও জন্ম নেয় বহু গল্প, বিস্ময়, আবেগ আর ইতিহাস। শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই এই মহাযজ্ঞের পরতে পরতে জমেছে এমন কিছু অবিশ্বাস্য, অদ্ভূত এবং রোমহর্ষক গল্প, যা অনেক সময় রূপকথার গল্পকেও হার মানায়! মাঠের একটি সাধারণ ভুলকে কেন্দ্র করে ঠান্ডা মাথায় নির্মম হত্যাকাণ্ড- বিশ্বকাপের ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চে ভরপুর, তেমনই কিছু অধ্যায় বেদনায় নীল। কখনো দুদেশের জেদের কারণে ম্যাচের বল নিয়ে অদ্ভুত জটিলতা, আবার কখনো বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে প্রিয় ট্রফি বাঁচাতে জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখার মতো থ্রিলার ঘরানার সত্য ঘটনাও ঘটেছে এই আসরকে কেন্দ্র করে। কখনো অক্টোপাসের ভবিষ্যদ্বাণী, কখনো হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে প্রিয় দলের খেলা দেখতে আসা সমর্থক, কখনো আবার যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ফুটবলের জন্য মানুষের এক হওয়ার ঘটনা—বিশ্বকাপ যেন মানবসভ্যতার এক বিচিত্র আয়না। খেলার এই মহাসম্মিলনের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যা আজও মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে স্মরণ করে। এসব নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন—হুমায়ূন কবির

অক্টোপাস পলের বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণী

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জার্মানির একটি অ্যাকোয়ারিয়ামে থাকা অক্টোপাস ‘পল’ বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ম্যাচের আগে দুটি বাক্সে দুদেশের পতাকা লাগিয়ে খাবার রাখা হতো। পল যে বাক্সটি বেছে নিত, সেটিকেই ধরা হতো তার পূর্বাভাস। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, জার্মানির সাতটি ম্যাচের ফল এবং ফাইনালে স্পেনের জয়ের পূর্বাভাসও সঠিকভাবে দিয়েছিল পল। এরপর বিশ্বজুড়ে তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে, বিভিন্ন দেশ তাকে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দেয়। যদিও পল ২০১০ সালের শেষ দিকে মারা যায়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সে আজও এক বিস্ময়কর চরিত্র।

জিদানের সেই ‘হেডবাট’

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচগুলোর একটি। ফ্রান্সের অধিনায়ক জিনেদিন জিদান মাঠে নেমেছিলেন বিদায়ী ম্যাচ খেলতে; কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন তিনি। এতেই রেফারি লাল কার্ড দেখান এই ফরাসি কিংবদন্তিকে। জিদান মাঠ ছাড়েন, আর শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইতালি। বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো অধিনায়কের লাল কার্ড পাওয়ার এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল। সেই মুহূর্ত আজও ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

ট্রফি চুরি হয়ে গিয়েছিল

১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরুর চার মাস আগে লন্ডনের এক প্রদর্শনী থেকে জুলে রিমে ট্রফি চুরি হয়ে যায়। পুরো ইংল্যান্ডে শুরু হয় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি। শেষ পর্যন্ত ‘পিকলস’ নামে একটি পোষা কুকুর রাস্তার পাশে কাগজে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফিটি খুঁজে পায়। একটি কুকুরের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ট্রফি উদ্ধারের এই ঘটনা ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত কাহিনি।

বিশ্বকাপ না খেলেই পরীক্ষা দিতে দেশে

প্রথম বিশ্বকাপকে পিকনিক মুডেই নিয়েছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলো। এটির গুরুত্ব তাদের কাছে কতটা কম ছিল, সেটা বোঝা যায় একটি ঘটনাতেই। আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক ম্যানুয়েল ফেইরা ছিলেন আইনের ছাত্র। গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ খেলেই তিনি দেশে ফিরে যান পরীক্ষার কারণে।

বিশ্বকাপে নাৎসিবাদের থাবা

ফ্রান্সে ১৯৩৮ সালের তৃতীয় বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে। সেবার প্রবর্তিত বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূলপর্বে সুযোগ করে নিলেও অস্ট্রিয়া বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি এডলফ হিটলারের দখলদারির কারণে। বিশ্বকাপের আগেই অস্ট্রিয়া দখল করে নেয় জার্মানি। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে কালো শার্ট পরে আর ম্যাচ শুরুর আগে ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে ইতালি দল। কালো শার্ট তখন ছিল ইতালির ফ্যাসিস্ট প্যারামিলিটারি বাহিনীর প্রতীক। যথারীতি সেবারও ট্রফি ঘরে তোলে মুসোলিনির ইতালি।

সবচেয়ে বড় অঘটন

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ১-০ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেয়। তৎকালীন সময়ে ইংল্যান্ড ছিল ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি, আর যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই ছিলেন অপেশাদার। এই ফল এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল যে ইউরোপের কিছু সংবাদপত্র প্রথমে ভুলবশত স্কোর ছাপিয়েছিল ‘ইংল্যান্ড ১০-১ যুক্তরাষ্ট্র’। আজও এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হয়।

বল নিয়ে ঝগড়া

প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। সে সময় বিশ্বকাপে ‘অফিসিয়াল বল’ বলে কিছু ছিল না। ফাইনালে দুই দলই দুটি বল মাঠে নিয়ে এসে আশা করে বসেছিল, রেফারি তাদের বলটি দিয়েই ফাইনাল খেলাবেন। এ নিয়ে ম্যাচ শুরুর আগে রীতিমতো ঝগড়াই বেধে যায়। পরে রেফারি দুই দলের মন রাখেন দুই অর্ধে দুই দলের দুই বল ব্যবহার করে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বলে তাদেরই আধিপত্য ছিল এবং শেষার্ধে উরুগুয়ের বলে তাদের আধিপত্য ছিল।

সুইডেন বিশ্বকাপ ছিল সিআইএর সাজানো!

সুইডেনের কিছু সাংবাদিক ১৯৫৮ বিশ্বকাপ নিয়ে অদ্ভুত এক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের মতে, পুরো বিশ্বকাপটাই ছিল সাজানো—যুক্তরাষ্ট্রে বসেই নাকি এই বিশ্বকাপের ফল ঠিক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএ। বৈশ্বিক চক্রান্তের অংশ হিসেবেই নাকি সিআইএ দেখতে চেয়েছিল টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানের ক্ষমতা কতটুকু, অনুষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে! যদিও পরে এই তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

শাসক যখন রেফারি নির্বাচক

দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে ইতালিতে। দেশটিতে তখন স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসন। মুসোলিনির কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বকাপে নানা বিতর্ক ডালপালা মেলে। কথিত আছে, ইতালির শাসক নাকি বিশ্বকাপে ইতালির ম্যাচগুলোর রেফারি নিজে নির্বাচিত করতেন। অনেকেই বলেন, তার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণেই ইতালি সে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়।

এক ম্যাচেই লাল কার্ডের বন্যা

২০০৬ সালের পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি পরিচিত ‘ব্যাটল অব ন্যুরেমবার্গ’ নামে। সেই ম্যাচে রেফারি দেখিয়েছিলেন ১৬টি হলুদ কার্ড ও ৪টি লাল কার্ড—যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক কার্ডের রেকর্ড।

স্টেডিয়ামে ১৬০০ রিভলভার

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক নাটকীয় মুহূর্ত আছে- শেষ মিনিটের গোল, বিতর্কিত রেফারির সিদ্ধান্ত, অঘটনের হার; কিন্তু একটি ঘটনা আছে যা শুনলে আজও চমকে উঠতে হয়। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে স্টেডিয়ামে প্রবেশের আগে দর্শকদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১ হাজার ৬০০টি রিভলভার!

ভেন্যুতে পৌঁছতে প্রায় ১৫ দিন!

আজকের দিনে বিমানে চড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে; কিন্তু ১৯৩০ সালে প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়াটা ছিল রীতিমতো এক মহা অভিযান। শুধু মাঠে নামার আগেই খেলোয়াড়দের পাড়ি দিতে হয়েছিল বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর- জাহাজে করে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে।

ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ড

ফুটবলকে বলা হয় সুন্দর খেলা। কিন্তু এই ফুটবলই যে কোনো মানুষের মৃত্যুর পরোয়ানা হয়ে আসতে পারে, তা কলম্বিয়ার মেদেলিন শহর দেখেছিল আজ থেকে ৩২ বছর আগে। ১৯৯৪ সালের ২ জুলাই, ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হয়েছিল এক অন্ধকার অধ্যায়ের, জাতীয় দলের ডিফেন্ডার আন্দ্রে এসকোবারকে গুলি করে হত্যা করে দেশটির অপরাধজগতের সদস্যরা।

ফুটবল বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য শুধু গোল, জয় কিংবা ট্রফিতে নয়—বরং মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য এবং অগণিত সত্য ঘটনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক অনন্য বৈশ্বিক উৎসবে। সেই কারণেই বিশ্বকাপ আজও শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ফুটবলের রঙে রাঙানো বিচিত্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কানাডা পশ্চিম বিএনপির সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি, স্থায়ী বহিষ্কারে কেন্দ্রে চিঠি

ছাত্রদলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে হামলা, রেঞ্জারসহ আহত ১৬

শিশু নন্দিনী হত্যা, পলাতক আসামি মমতা গ্রেপ্তার

পালিত বলি মহিষে প্রাণ গেল কৃষকের

ট্রাম্পের জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব আদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাতিল

দূরন্ত ফ্রান্সকে হারানোর কঠিন মিশনে সুইডেন

চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষককে আবেগঘন বিদায় সংবর্ধনা

২ জুলাই শুরু হচ্ছে ১৯তম ‘অ্যাসেন্ট কর্পোরেট কাপ-২০২৬’

অবসরে গেলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৩ কর্মকর্তা

১০

বাজেটকে ‘অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে না ভোট দিল বিরোধীদল

১১

লেজার প্রযুক্তি-সংযুক্ত আয়রন ডোমের সফল পরীক্ষা চালাল ইসরায়েল

১২

ভাতিজাকে অপহরণ ও হত্যায় চাচার মৃত্যুদণ্ড

১৩

পাকিস্তানে কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত

১৪

দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা: প্রধানমন্ত্রী

১৫

গলায় বাদাম আটকে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু

১৬

হাত বাঁধা, গলায় রশি পেঁচানো নারীর রক্তাক্ত মরদেহ, রহস্য উদ্‌ঘাটন

১৭

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজেট পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল

১৮

ভারতীয় ভিসা আবেদনে ‘টাইম স্লট’ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

১৯

বিশ্লেষণ / ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিজয়ী চীন

২০
X