

ফুটবলে শুধু কৌশল ও ধারাবাহিকতাই নয়, অনেকে বিশ্বাস করেন—ভাগ্যও বড় একটা ব্যাপার। যখন লাখ লাখ সমর্থকের আনন্দ জড়িয়ে থাকে মাঠের ১১ জনের পারফরম্যান্সের সঙ্গে, তখন অনেক খেলোয়াড়ই যুদ্ধি-বুদ্ধি পাশ কাটিয়ে আশ্রয় নেন কুসংস্কারে। বিশ্বজুড়ে বহু ফুটবলার নিজেদের সফলতার পেছনে ‘লাকি জার্সি’ থেকে শুরু করে ‘বিশেষ রুটিন’—সব কিছুকে গুরুত্ব দেন। কেউ কেউ তো এক জোড়া অন্তর্বাসকে পর্যন্ত সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করেন! পেলে থেকে শুরু করে রোনালদো, ক্যাসিয়াস, এমনকি ফুটবলে দলীয় কুসংস্কারের গল্পও শোনা যায়।
পেলের জার্সি
ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে কেবল জাতীয় দলেরই নয়, ক্লাব ফুটবলেও ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এ ফুটবলই তাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে ফেলে। তিনি একবার তার জার্সি এক ভক্তকে উপহার দিয়ে দেন। দুর্ভাগ্যক্রমে এর পরপরই পেলে ফর্মহীনতায় ভুগতে থাকেন। পেলে তখন এক বন্ধুকে দায়িত্ব দেন, যেখান থেকে পারা যায় সেই ভক্তকে খুঁজে বের করে জার্সি ফিরিয়ে আনতে হবে। সপ্তাহ খানেকের চেষ্টার পর বন্ধুটি পেলেকে সেই জার্সিটি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন। পেলেও ফিরে পান হারানো ছন্দ! পেলে ধরেই নিয়েছিলেন, সেই জার্সির সঙ্গে সঙ্গে চলে গিয়েছিল তার গোল করার সৌভাগ্যও!
মজার ব্যাপার হলো, বন্ধুটি আসলে সেই ভক্তকে খুঁজে বের করতে পারেননি। যখন বুঝেছিলেন, এটা পেলের জন্য মানসিক একটা বাধা হয়ে উঠেছে, বুদ্ধি করে একই রকম দেখতে আরেকটি শার্ট পেলেকে ফেরত দেন। ভাগ্যিস বন্ধুটি সেদিন মিথ্যে বলেছিলেন কালো মানিকের কাছে। নইলে ফুটবলের ইতিহাসই হয়তো হতো অন্যরকম।
রোনালদোর ডান পা
পর্তুগালের মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই তারকার সাফল্যের পেছনে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও আত্মনিবেদনের গল্প সবারই জানা। তবে তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু ব্যক্তিগত কুসংস্কারও।
খেলার আগে কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস তিনি সবসময় অনুসরণ করেন। বিমানে করে কোনো ম্যাচ খেলতে গেলে অবতরণের পর তিনি প্রথমে ডান পা মাটিতে রাখেন। তার বিশ্বাস, এটি তার জন্য শুভ। একইভাবে ফ্রি-কিক নেওয়ার সময়ও নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়াতে দেখা যায় তাকে।
ক্লাব ও জাতীয় দলে আবার এ অভ্যাসে রয়েছে ভিন্নতা। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলার সময় মাঠে নামার আগে টানেল থেকে সবার শেষে বের হতেন রোনালদো। কিন্তু পর্তুগাল জাতীয় দলের জার্সিতে ঠিক উল্টোটা করতেন—সবার আগে মাঠে প্রবেশ করতেন। এসব অভ্যাস তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করত বলে মনে করা হয়।
শুধু রোনালদোই নন, ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওও ম্যাচের আগে ডান পা দিয়ে মাঠে নামার অভ্যাস মেনে চলতেন। বিশ্ব ফুটবলে এমন অনেক তারকাই আছেন, যারা সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কিছু ব্যক্তিগত রীতি বা কুসংস্কার অনুসরণ করেন।
ম্যাচ জিততে জাদুকরের শরণাপন্ন
অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে বহু বছর ধরে একটি জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে, যা ‘মোজাম্বিক অভিশাপ’ নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মোজাম্বিকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন খেলোয়াড় এক স্থানীয় জাদুকরের (উইচ ডক্টর) সাহায্য নেন। ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে জয়ের পর প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়ায় তিনি দলটিকে অভিশাপ দেন। এরপর দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপে সাফল্য না পাওয়াকে অনেকেই সেই অভিশাপের ফল বলে মনে করেন। পরে সাবেক ফুটবলার ও কর্মকর্তারা মোজাম্বিকে গিয়ে প্রতীকী আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যা গণমাধ্যমে ‘অভিশাপ মোচন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এর কিছুদিন পরই অস্ট্রেলিয়া ২০০৬ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। তবে এ ঘটনাকে অনেকে ফুটবল লোককাহিনি হিসেবে উল্লেখ করেন।
মাঠে প্রস্রাব করলেই পেনাল্টিতে জয়!
মাঠে প্রস্রাব করলেই পেনাল্টি আটকানো যাবে। এমন ভাবনা বদ্ধমূল হয়েছিল সাবেক আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়ার।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি পেনাল্টি শুটআউটে গড়ায়। অতিরিক্ত পানি পান করার কারণে গয়কোচিয়ার প্রচণ্ড বাথরুমের চাপ ছিল, কিন্তু মাঠের বাইরে যাওয়ার মতো সময় ছিল না। অগত্যা তিনি সবার অজান্তেই মাঠের মধ্যেই প্রস্রাব করে দেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জিতে যায়।
একই আসরে সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষেও ম্যাচ গড়াল পেনাল্টিতে। কী মনে হলো, সার্জিও গয়কোচিয়া এবারও মাঠে প্রস্রাব করলেন। তাজ্জব হয়ে নিজেই টের পেলেন, পেনাল্টি আটকে আর্জেন্টিনাকে জেতাতে পেরেছেন তিনি!
তখন থেকেই তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, পেনাল্টির আগে যদি মাঠে প্রস্রাব করা যায়, তাহলেই পেনাল্টিতে জয় পাওয়া যাবে। সার্জিও নিজেই এ তথ্য স্বীকার করেছেন।
ইকার ক্যাসিয়াসের কুসংস্কার
স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী ও রিয়াল মাদ্রিদের তারকা গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস ফুটবল মাঠে তার নানারকম অদ্ভূত কুসংস্কার ও বাতিকের জন্য বেশ পরিচিত ছিলেন। ফুটবল মাঠে নামার আগে ও পরে অদ্ভূত সব কর্মকাণ্ড করতেন তিনি এবং সেগুলো মনেপ্রাণে মেনেও চলতেন।
ক্যাসিয়াস নিজের জার্সির হাতা কেটে ফেলতেন, কখনো বা ইচ্ছে করে মোজা পরতেন উল্টো করে। আর সবচেয়ে বেশি যা করতেন, তা হলো গোল লাইন পর্যন্ত বাঁ পা দিয়ে চিহ্ন দিয়ে রাখতেন। এগুলো তার বেশ কাজেও দিত! তার দাবি, প্রায়ই নাকি ফল পেতেন হাতেনাতে!
আরও যারা আছেন এ তালিকায়
এ ছাড়া আরও অনেক ফুটবলার কুসংস্কারে বিশ্বাস করতেন। যেমন কিংবদন্তি ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার বিশ্বাস করতেন—তার ভাগ্যে বরাদ্দকৃত মোট গোলের সংখ্যা সীমিত। যদি তিনি অগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই তার সেই সীমিত বরাদ্দ থেকে গোল করে ফেলেন, তাহলে টান পড়ে যাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের গোল সংখ্যায়!
আরেক ইংলিশ কিংবদন্তি ববি মুর মাঠে নামের আগে ড্রেসিং রুমে সবার পরে শর্টস পড়তেন। তার বিশ্বাস ছিল, এটা তার মাঠের খেলায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক জন টেরি মাঠের সৌভাগ্যের প্রত্যাশায় সবসময় টিম বাসের একই সিটে বসেন, প্যাডের চারিদিকে তিনবার করে টেপ আঁটেন, অনুশীলনে যাওয়ার সময় গাড়িতে একই গান শুনে থাকেন এবং গাড়িটি পার্কিংয়ের একই জায়গাতেই পার্ক করে থাকেন।