

শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিশ্বকাপ ভার্সন—শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নামছে স্পেন ও পর্তুগাল। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের দুই প্রতিবেশীর দ্বৈরথ শুরু ১৯২১ সালে, মাদ্রিদের প্রীতি ম্যাচে। শতাব্দীদীর্ঘ এই ফুটবল লড়াইয়ের পোশাকি নাম ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’। এটি এখন দুই দলের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার ভেলা—পর্তুগাল প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার খোঁজে, ২০১০ সালের মুকুট পুনরুদ্ধারের মিশনে স্পেন।
দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ৪১ বার—২৯ প্রীতি ম্যাচ, বাকিগুলো প্রতিযোগিতামূলক। সামগ্রিক পরিসংখ্যানে স্পেনই এগিয়ে, ১৮ জয় নিয়ে। পর্তুগালের জয় সংখ্যা ৭। বাকি ম্যাচ ছিল নিষ্ফলা। ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে মাদ্রিদে স্পেনের কাছে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল পর্তুগাল, যা এই দ্বৈরথের ইতিহাসে আজও সবচেয়ে বড় ব্যবধান। সংখ্যার এই ব্যবধান মাঠের লড়াইয়ের তীব্রতা কমাতে পারেনি কখনো। ২০১০ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় কেপটাউনে ডেভিড ভিয়ার একমাত্র গোলে স্পেন জিতেছিল ১-০ ব্যবধানে। যে জয় শেষ পর্যন্ত তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে ওঠে। আট বছর পর রাশিয়ায় গ্রুপ পর্বের সেই বিখ্যাত ৩-৩ ড্র, যেখানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো করেছিলেন হ্যাটট্রিক।
ইউরোর মঞ্চেও এই লড়াই কম নাটকীয় ছিল না। ২০০৪ সালে নিজেদের মাটিতে নুনো গোমেজের গোলে পর্তুগাল হারিয়েছিল স্পেনকে, আর ২০১২ সালের সেমিফাইনালে গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতে প্রতিশোধ নিয়েছিল স্পেন। সবশেষ সাক্ষাতে অবশ্য হাসি ছিল পর্তুগালের মুখে—২০২৫ সালের নেশনস লিগ ফাইনালে ২-২ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে শিরোপা ঘরে তুলেছিল দেশটি। ৬১ মিনিটে সমতাসূচক গোল করেছিলেন রোনালদো নিজেই, স্পেনের হয়ে নির্ধারক পেনাল্টি মিস করেছিলেন আলভারো মোরাতা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দলের এই পর্বে উঠে আসা ভিন্ন ধাঁচে। রবার্তো মার্টিনেজের পর্তুগাল ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়েছে ২-১ গোলে, রোনালদো পেনাল্টি থেকে করেছেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ নকআউট গোল। গঞ্জালো রামোস যোগ করা সময়ে করেছেন জয়সূচক গোলটি। অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে দিয়েছে ৩-০ ব্যবধানে, মিকেল ওইয়ারসাবালের জোড়া গোল আর পেদ্রো পারো হেডে। ফিফা র্যাংকিংয়ে স্পেন রয়েছে তিন নম্বরে, পর্তুগাল সাত নম্বরে—দুই দলই তাই প্রকৃত অর্থে ফুটবলবিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের দল।
তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার দ্বৈরথ এই ম্যাচকে দিচ্ছে বাড়তি মাত্রা। একদিকে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো, যার জন্য এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। অন্যদিকে চোট কাটিয়ে ফেরা ১৮ বছরের লামিনে ইয়ামাল, যাকে ঘিরেই বোনা হচ্ছে স্পেনের আক্রমণের নকশা। স্পেনের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিকো উইলিয়ামস, কুঁচকির চোটে যিনি ছিটকে গেছেন আসর থেকেই। রদ্রি-পেদ্রির মাঝমাঠ আর পোরো-কুবার্সির রক্ষণ নিয়ে স্পেন এখন পর্যন্ত এই আসরে কোনো গোল হজম করেনি, যা তাদের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বিপরীতে পর্তুগালের ভরসা মূলত রোনালদোর অভিজ্ঞতা আর সেটপিসের ওপর, সঙ্গে ব্রুনো ফের্নান্দেস ও ভিতিনিয়ার মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যে।
শত বছরের এই দ্বৈরথ আরেকবার প্রমাণ করতে চলেছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে লড়াইয়ে ইতিহাস যতটা ভারী থাকে, বর্তমানও ঠিক ততটাই তীব্র হয়ে ওঠে। এক শতাব্দী আগে মাদ্রিদের সেই প্রথম স্মরণীয় সাক্ষাৎ থেকে আজকের ডালাস পর্যন্ত—বদলেছে সময়, বদলেছে প্রজন্ম; বদলায়নি শুধু প্রতিবেশীর বিপক্ষে জয়ের ক্ষুধা। ডালাসের সন্ধ্যার মাঠে যে গল্প লেখা হবে, তা শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং একশ বছরের পুরোনো গল্পের নতুন অধ্যায়। যেখানে জয়ীর নাম যা-ই হোক, ফুটবলপ্রেমীরা আরেকবার সাক্ষী হবেন আইবেরিয়ান গর্বের এক অনন্য লড়াইয়ের।