

এক সময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, ডাংগুলি, চড়ুইভাতি, মার্বেল, কানামাছি, ইচিংবিচিংসহ নানা রকম খেলাধুলা। আধুনিকতার আগ্রাসনে আজ এসব খেলা শিশু-কিশোরদের কাছে প্রায় অপরিচিত। তবে সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার মাঝেও ব্যতিক্রম হয়ে শতবর্ষী এক ঐতিহ্য আজও টিকে আছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার দেওখোলা ইউনিয়নে, যেখানে তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত রয়েছে শতবর্ষী ঐতিহ্য হুম গুটি বা গুম গুটি খেলা।
গতকাল বুধবার বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিনে (পহুরা) ফুলবাড়িয়ার দেওখোলা ইউনিয়নের তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রামের এক পতিত ধানের জমিতে অনুষ্ঠিত হয় অনন্য এ খেলার ২৬৭তম আসর। এ খেলা ঘিরে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। খেলা আয়োজনের পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে স্থানীয় হুম গুটি স্মৃতি সংসদ আয়োজন করে নানা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
খেলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যুক্ত হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী ও বৈলরের জমিদার হেম চন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির সীমানা ও পরিমাপ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি অনন্য পদ্ধতি হিসেবে এ খেলার সূচনা হয়। শক্তি ও কৌশলের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী পক্ষের এলাকার জমির পরিমাপ নির্ধারিত হয় সাড়ে ৬ শতাংশে এক কাঠা এবং পরাজিত পক্ষের এলাকায় ১০ শতাংশে এক কাঠা হিসেবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রজারাই সে খেলায় জয়লাভ করে এবং সে নিয়ম আজও বহাল রয়েছে।
পৌষ সংক্রান্তির এই দিনটি এখানে ‘পহুরা’ নামে পরিচিত। খেলার দিন গ্রামজুড়ে বসে মেলা, তৈরি হয় পিঠাপুলি ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। কোথাও গরু, কোথাও খাসি জবাই—সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল পরিণত হয় এক লোকজ উৎসবে।
খেলার মূল আকর্ষণ প্রায় ৪০ কেজি ওজনের পিতলের আবরণে মোড়ানো একটি গোলাকার বল, যাকে বলা হয় ‘গুটি’। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ—এই চার দলের খেলোয়াড়রা এতে অংশ নেন। এখানে রেফারি, নির্দিষ্ট সময় বা খেলোয়াড় সংখ্যার বাঁধাধরা নিয়ম নেই। সন্ধ্যার পর টর্চলাইটের আলোয় রোমাঞ্চ বাড়ে। চারদিক থেকে ‘হুম হুম’ ধ্বনি ভেসে আসে। রাতের কোনো এক সময় হাজারো মানুষের ভিড়ে গুটিকে লুকিয়ে ফেলার মধ্য দিয়েই খেলার সমাপ্তি ঘটে।
হুম গুটি স্মৃতি সংসদের সভাপতি ও নাট্যকার আবুবক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘এ খেলাটি আমাদের শিকড়ের ঐতিহ্য। আমার পূর্বপুরুষরা এ আয়োজন শুরু করেছিলেন। জমিদার আমলের জমি বিরোধ মেটানোর এ খেলা আজ জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে স্থানীয় জনগণের অকুণ্ঠ চেষ্টায়। প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিনে আমরা খেলাটি আয়োজন করি। এ বছর অনুষ্ঠিত হলো ২৬৭তম আসর।’