

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। এবার ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপির জন্য ৩৬টি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব আসনের বিপরীতে বিএনপি থেকে অন্তত শতাধিক নারী নেত্রী আলোচনায় আছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের স্ত্রী-কন্যারাও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজপথের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ত্যাগী নেত্রীরাই অগ্রাধিকার পাবেন।
প্রসঙ্গত, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম জাতীয় সংসদে ১৫টি, দ্বিতীয় থেকে সপ্তম সংসদ পর্যন্ত ৩০টি, অষ্টম সংসদে ৪৫টি, নবম সংসদ থেকে সংরক্ষিত ৫০টি আসন রয়েছে। এদিকে জুলাই সনদ অনুযায়ী এই সংখ্যা ১০০ করার কথা থাকলেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ৫০টি আসনের বিপরীতেই ভোটের তপশিল ঘোষণা করেছে ইসি। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সাধারণ আসনে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রাপ্ত আসনের সংখ্যানুপাতিক হারে এই আসন বণ্টন করা হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে পরোক্ষ নির্বাচনে এই আসনগুলো পূর্ণ করা হয়।
জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসন আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের কয়েকজন নেতা জানান, ইসির তপশিল অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিএনপিতে যোগ্য নারী নেত্রীর সংখ্যা অনেক। তাদের রাজনৈতিক ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও অবদান বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি। বাকি আসনগুলোতে বিভিন্ন জোট, দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন কখনো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বিকেলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন।
এবার সংরক্ষিত নারী আসনে কারা হতে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ২ হাজার ২৮ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮৬ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তাদের সাফল্যের হার বেশ ইতিবাচক। এবার সরাসরি ভোটে জয়ী হয়েছেন সাত নারী প্রার্থী। যে সাতজন নির্বাচিত হয়েছেন তারা সবাই বিএনপি নেত্রী হলেও একজন দল থেকে বহিষ্কারের পর স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী (রুমিন ফারহানা) হয়ে জয়লাভ করেছেন।
জানা যায়, এবার সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে মনোনয়নের জন্য আগ্রহী বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের শতাধিক নেত্রী। যাদের অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত এবং মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হওয়া প্রার্থী। তরুণ প্রজন্মের নেত্রীরা বিশেষ করে বিগত ১৭ বছরে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন তাদের নামও আলোচনায় আছে। তাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রবীণ নেত্রীও জায়গা পেতে পারেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ঢাকায় অবস্থান করে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরও করছেন। তবে মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের হাইকমান্ডের।
এ বিষয়ে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি কালবেলাকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজপথের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ত্যাগী নেত্রীরাই অগ্রাধিকার পাবেন। যারা রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং সংসদে ভূমিকা রাখতে পারবেন, এমন নেত্রীদেরই সংসদ নেতা খুঁজে বের করবেন।’ চিফ হুইপ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, নারীরা সংসদে আসুক। যত দ্রুত আসবে ততই লাভ। নারীদের ক্ষমতায়নের জন্যই আমরা ফ্যামিলি কার্ড করেছি। রাজনীতিতে যারা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং সংসদে কন্ট্রিবিউট করতে পারেন, তাদেরই আমরা অগ্রাধিকার দেব। আমি মনে করি সংসদ নেতার সিদ্ধান্ত নির্ভুল হবে এবং তিনি সব সেকশনের রিপ্রেজেন্টেশন নিশ্চিত করবেন।’
আলোচনায় শতাধিক নেত্রী
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য আলোচনা আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান। তিনি ২০০১ সালে সংরক্ষিত আসনে এমপি এবং মন্ত্রী ছিলেন। নরসিংদী থেকে শিরিন সুলতানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও নির্বাচিত সিনেট সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আরও আলোচনা আছেন ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের স্ত্রী ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়ারিস সিমকী। যিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) পরিচালক। সাবেক এমপিদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ফেনী থেকে রেহানা আক্তার রানু, জামালপুর থেকে নিলোফার চৌধুরী মনি, মাগুরা থেকে নেওয়াজ হালিমা আর্লি, মাদারীপুর থেকে হেলেন জেরিন খান, ঢাকা থেকে সুলতানা আহাম্মেদ, চাঁদপুর থেকে রাশেদা বেগম হীরা, হবিগঞ্জ থেকে শাম্মী আক্তার। তা ছাড়া সিরাজগঞ্জ থেকে সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা এবং নীলফামারী থেকে বেবী নাজনীনসহ বেশ কয়েকজন আলোচনায় আছেন।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ থেকে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও গৌরীপুর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তানজিন চৌধুরী লিলি। যিনি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি। এ অঞ্চল থেকে আরও আলোচনায় আছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি এবং ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি ফাহসিনা হক লিরা। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। পাবনা থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমাও রয়েছেন আলোচনায়। রুমা ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী। রাজপথে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ফ্যাসিস্ট আমলে হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। আলোচনায় আছেন বরগুনা থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ। রাজশাহী থেকে বিএনপি নেত্রী মাহমুদা হাবিবা ও রাজশাহী জেলা মহিলা দলের সভাপতি শামসাদ বেগম মিতালী। ঝিনাইদহ থেকে মহিলা দল নেত্রী মৌসুমি নাছরিন, ঢাকা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী এবং মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া চৌধুরী বেবিও আলোচনায় আছেন।
এ ছাড়া গোপালগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সাবরিনা বিনতে আহমেদ, ফেনী থেকে অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, নরসিংদী থেকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, মাদারীপুর থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী অ্যাডভোকেট শওকত আরা উর্মি, মুন্সীগঞ্জ থেকে নাসিমা আক্তার কেয়া, মানিকগঞ্জ থেকে মনিরা আক্তার রিক্তা, বরিশাল থেকে আফরোজা খানম নাসরিন, লক্ষ্মীপুর থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বিথিকা বিনতে হুসেইন, মানিকগঞ্জ থেকে রুকসানা খানম মিতু, বাগেরহাট থেকে আয়শা সিদ্দিকা মানি, কুমিল্লা থেকে হেনা আলাউদ্দিন, কুষ্টিয়া থেকে ফরিদা ইয়াসমিন, নারায়ণগঞ্জ থেকে অ্যাডভোকেট সালমা আক্তার সোমা, নরসিংদী থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস ও নিলুফা ইয়াসমিন নিলু, নোয়াখালী থেকে অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম সাগর, বান্দরবান থেকে আলীকদম উপজেলা পরিষদের চারবারের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বান্দরবান জেলা মহিলা দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিরিনা আক্তার, বিএনপির সাবেক নেতা মরহুম হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের (লেচু মিয়া) মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন অন্যতম।
যুগপতের শরিকদলের নেতাদের স্ত্রী-কন্যারাও মনোনয়প্রত্যাশী
এ ছাড়া যুগপৎ আন্দোলন শরিক দল ও জোট থেকেও আলোচনায় আছেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা জেএসডির সভাপতি আ স ম রবের স্ত্রী তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান এহসানুল হুদার স্ত্রী রোকসানা শারমিন, সমমনা জোটের ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের স্ত্রী অধ্যাপক এমরানা আক্তার, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তসলিমা নাসরিন, গণসংহতি আন্দোলন শীর্ষ নেতা ট্রাকচাপায় নিহত আরিফুল ইসলামের স্ত্রী রেবাকা নীল, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকের মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. মোশরেকা অদিতি হক, ১২ দলীয় জোটের জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মেয়ে জয়া কাজী।
সাবেক মহিলা এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি কালবেলাকে বলেন, ছাত্রজীবন থেকে দলের সঙ্গে আছি। গত ১৭ বছর আওয়ামী সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তবে দল ছেড়ে কোথাও যাইনি। আশা করি, দলের হাইকমান্ড ত্যাগীদের মধ্যে থেকেই নির্বাচন করবেন কারা সংসদে যাবে।
গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তানজিন চৌধুরী লিলি কালবেলাকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বিগত দিনে সব আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি দল আমার বিগত দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করবে।
ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমা কালবেলাকে বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছি। কখনও দল ছেড়ে যাইনি। কারও সঙ্গে আঁতাতও করিনি। আমার প্রত্যাশা দুর্দিনের নেতাকর্মীদের দলের হাইকমান্ড, যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেন।