আবুল হাসনাত, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১০:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

চমেকে নতুন কৌশলে ফিরছে পুরোনো দালাল সিন্ডিকেট

রোগী ও স্বজনরা হয়রানির শিকার
ছবি : কালবেলা
ছবি : কালবেলা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার ও সাজার আওতায় আনা হলেও থামছে না তাদের দৌরাত্ম্য। রোগী বাগিয়ে নেওয়া, ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কমিশন বাণিজ্য, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ, মৃতদেহ পরিবহনে প্রভাব বিস্তার এবং হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এ চক্র। আইনগত সীমাবদ্ধতা ও নজরদারির দুর্বলতার সুযোগে পুরোনো সদস্যদের পাশাপাশি নতুন মুখও যুক্ত হচ্ছে সিন্ডিকেটে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও স্বজনরা প্রতিনিয়ত হয়রানি ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল হিসেবে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসা নিতে আসা এসব রোগীর বড় একটি অংশ গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের মানুষ। হাসপাতালের পরিবেশ, চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা সেবা গ্রহণের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তারা সহজেই দালালদের টার্গেটে পরিণত হন। কমিশন বাণিজ্য আর চাঁদাবাজি থেকেই দালালচক্রের আয় মাসে কোটি টাকার বেশি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আড়ালে কারা এ সিন্ডিকেট চালায় তা অনেকটা প্রকাশ্য হলেও তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নন কেউ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দালালদের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ২০ মার্চ র‌্যাব-৭ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে ৩৯ দালালকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সেই সময় র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব আলম জানিয়েছিলেন, হাসপাতালের বেড সিন্ডিকেট, ওয়ার্ড সিন্ডিকেট, ওষুধ সিন্ডিকেট ও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। দালালরা রোগীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নির্দিষ্ট ফার্মেসি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং কমিশন গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবারও অভিযান চালিয়ে ১১ দালালকে আটক করা হয়। ওই সময় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রোগীদের হাতে থাকা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে টানাটানি, রোগী বাগিয়ে নেওয়া এবং স্বজনদের সঙ্গে দরকষাকষির অভিযোগ পাওয়া যায় এ দালাল চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে। একই বছরের ২৫ জুন র্যাব-৭ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অভিযান চালিয়ে আরও ২১ দালালকে আটক করে। অভিযানে উঠে আসে রোগী বাগিয়ে নেওয়া, ফার্মেসি কমিশন বাণিজ্য এবং অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণের নানা তথ্য।

তবে এসব অভিযানের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আটক হওয়া অনেকেই কিছুদিন আড়ালে থাকার পর আবার সক্রিয় হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কিছু ব্যক্তি ও গ্রুপও এ নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মামলা না হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালে দালালের উৎপাত কমেছে। যদিও ভুক্তভোগীরা বলছেন, হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে।

সরেজমিন হাসপাতাল এলাকায় দেখা যায়, বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে, বহির্বিভাগের আশপাশে, পূর্ব গেট, পশ্চিম গেট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিগুলোর সামনে কিছু ব্যক্তি সার্বক্ষণিক অবস্থান করছে। রোগী বা স্বজনদের হাতে ব্যবস্থাপত্র দেখলেই তারা এগিয়ে গিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়। পরে কৌশলে নির্দিষ্ট ফার্মেসি বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়।

বাঁশখালী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী রোগীর স্বজন নারগিস আক্তার বলেন, ‘চিকিৎসকের দেওয়া স্লিপ হাতে নিয়ে নিচে নামার পরপরই এক ব্যক্তি তাদের কাছে এসে সহযোগিতার কথা বলেন। পরে তিনি একটি নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে নিয়ে যান। সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধের সঙ্গে অতিরিক্ত ওষুধও ধরিয়ে দেওয়া হয়।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান চিকিৎসা নিতে আসা কৃষক মিসকাত। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কিনতে গিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ টাকার বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। পরে অন্যদের কাছ থেকে জানতে পারেন, কিছু ওষুধের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি নেওয়া হয়েছে।’

বিগত সময়ে অভিযান চলাকালে র্যাবের তদন্তেও উঠে এসেছে, দালালরা সরকারি হাসপাতালের রোগীদের স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের ওষুধ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। পরে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করা হয়। একইভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়। এর বিনিময়ে দালালরা কমিশন পেয়ে থাকে।

চমেক ঘিরে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে মৃতদেহ পরিবহনের ক্ষেত্রে এ চক্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালের পূর্ব গেট, ওয়ার্ড এলাকা, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আশপাশ এবং অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ডে তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

অভিযোগ রয়েছে, বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিতে বা মৃতদেহ পরিবহন করতে এলে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের বলা হয়, নির্দিষ্ট গাড়ি ছাড়া লাশ নেওয়া যাবে না। ফলে শোকাহত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এ অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত কয়েকজন এবং চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির লোকজন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতির ইউসুফ বলেন, ‘এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা কাউকে বাধা দিই না। যে যার মতো অ্যাম্বুলেন্স আনা-নেওয়া করে। কারও ওপর আমাদের কোনো চাপ নেই।’

হাসপাতালকেন্দ্রিক কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত একটি নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে সুমন নামে এক ব্যক্তি রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্র। তাদের দাবি, আব্দুল্লা, রাহাত উল্লাহ, রবিন, খলিফা জাহাঙ্গীর, আরিফ ও হাসানসহ কয়েকজনের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাসপাতালকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। রোগীকে নির্দিষ্ট ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, কমিশন বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সেবা ঘিরে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, জাহাঙ্গীর নামের একজন একটি রাজনৈতিক দল ও মেডিকেল ইউনিট স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক পরিচয় ব্যবহার করে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে হাসপাতাল সংলগ্ন কিছু ফার্মেসি ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জাহাঙ্গীর এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি সাংবাদিক হিসেবে তদন্ত করুন। যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য পান, তাহলে সংবাদ প্রকাশ করুন। আমি কোনো ফার্মেসি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই।’

অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ঘিরে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, হাসপাতালের পূর্ব গেট ও আশপাশের এলাকায় অস্থায়ী দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। অলি খাঁ মসজিদ থেকে বদনা শাহ মাজার পর্যন্ত দেড় শতাধিক দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একাধিক দোকানি জানান, টাকা না দিলে দোকান বসাতে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতিও দেখানো হয়। ফলে বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়।

সরেজমিন কেবি ফজলুল কাদের রোডের স্টাফ কোয়ার্টার থেকে চমেক হাসপাতালের পশ্চিম গেট পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ডাব, ফলমূল, চা-সিগারেট ও কাপড়ের অসংখ্য অস্থায়ী দোকান দেখা গেছে। এসব ব্যবসায়ী মূলত রোগী ও স্বজনদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার কারণে ব্যবসার খরচ বাড়ছে এবং এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ছে।

এ বিষয়ে র্যাব-৭, চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এসব অসাধু ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান পরিচালনা করব।’ এ বিষয়ে জানতে মেডিকেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শোকজের সন্তোষজনক জবাব না পেলে আদ-দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

শেরপুর সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা রুখে দিল বিজিবি

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশের সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে সরকার : অর্থ উপদেষ্টা

৩২০ কোটিতে বিশ্বকাপ দেখানোর স্বত্ব কিনল যে চ্যানেল

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক

ককরোচ জনতা পার্টির ‘জেন-জি’ বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি, নিরাপত্তা জোরদার

বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ / ১১ জনকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়নি বিজিবি

বিজিবির বাধায় পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ, ৩৩ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ

ভারতের মাটিতে আজ ভারতকে হারাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ

বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঘুঘুর বাচ্চা নামাতে গিয়ে প্রাণ গেল কিশোরের

১০

পরিচালক প্রার্থীদের কাছে তামিমের অনুরোধ

১১

বাংলাদেশ-ভারতের লড়াই কি শুধুই ট্রফির?

১২

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

১৩

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি-লঞ্চ চলাচল বন্ধ

১৪

শেয়ারহোল্ডারদের সর্বসম্মত অনুমোদন / ওয়ালটন হাই-টেকের সঙ্গে ডিজি-টেকের একীভূতকরণ চূড়ান্ত পর্যায়ে

১৫

শেষ সূর্য জমানা! ভারতের নতুন টি-২০ অধিনায়ক শ্রেয়াস

১৬

ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ৭ মাসের ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু

১৭

আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ বেআইনি : শিশির মনির

১৮

জলবায়ু বার্তা ও বিশ্ব পরিবেশ দিবসের কর্মসূচি সংক্রান্ত বৈঠকের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী

১৯

১৫ বছরেই জাতীয় দলে ডাক পেয়ে ইতিহাস গড়লেন বৈভব সূর্যবংশী

২০
X