বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
দিবাকর বিশ্বাস
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের গোধূলিতে এক কাঙ্গালিনীর কান্না

কাঙ্গালিনী সুফিয়া। ছবি - কালবেলা
কাঙ্গালিনী সুফিয়া। ছবি - কালবেলা

ভালো নেই লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। এক সময় যে কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হতো অসংখ্য শ্রোতা, তার ঘরেই এখন খাবার নেই। হাত ভেঙে পড়ে আছেন বিছানায়। চিকিৎসার টাকা নেই। জীবনের গোধূলি বেলায় দুর্বিষহ এক জীবন কাটাচ্ছেন এই কণ্ঠশিল্পী। সরেজমিন কাঙ্গালিনী সুফিয়ার বাড়ি ঘুরে এসে লিখেছেন— দিবাকর বিশ্বাস

রাজবাড়ীর সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুরে কাঙ্গালিনী সুফিয়ার বাড়ি। গত বৃহস্পতিবার তার বাড়িতে যায় কালবেলার টিম। সেখানে পৌঁছে প্রতিবেদক দেখতে পান ভাঙা হাত নিয়ে বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন কাঙ্গালিনী সুফিয়া।

ছোট্ট একটি ঘর। সরকারিভাবে পাওয়া সেই ঘরেই এখন থাকেন এই লোকসংগীতশিল্পী। ঘরজুড়ে অসহায়ত্ব আর দরিদ্রতার ছাপ। ঋণের দায় মেটাতে সাভারের বাড়িটি বিক্রি করেছেন আগেই। সম্বল বলতে এখন শুধু এই ঘরটিই। তবে টাকার অভাবে কখনো আবার বিদ্যুৎ বিলও দিতে পারেন না তিনি।

কয়েক দিন আগে বাথরুমে পড়েগিয়ে হাত ভাঙে তার। সেই দুর্ঘটনা নিয়ে সুফিয়া বলেন, ‘শরীরের অবস্থা ভালো না। উচ্চ রক্তচাপের কারণে ১৪ দিন আগে মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে যাই। মাঝেমাঝে প্রচণ্ড ব্যথা হয় আর চিলিক মারে। হাত অবশ হয়ে আসে। মনে হয় বেশিদিন টিকব না।’

হাত ভাঙার পর টাকার অভাবে প্রথমে চিকিৎসাই করাতে পারেননি। ব্যথায় চিৎকার করেছেন, কেঁদেছেন। আবার জীবনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘হাত ভাঙার পর ঘরে পড়ে ছিলাম অনেক দিন। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি। ডিসি সাহেবের কাছে গেছিলাম। ৭ হাজার টাকা দিছে। সাড়ে ৪ হাজার টাকা কারেন্ট বিল দিছি। এরপর বাকি টাকা দিয়া ব্যান্ডেজ করছি। এখন মেয়ে ওষুধ কিনে আনবে।’

এই শিল্পীর ঘরে কখনো রান্না হয়, কখনো হয় না। চুলা না জ্বললে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। টাকার অভাবে কখনো অন্যের দেওয়া খাবার খেয়ে কাটাতে হয় দিন। যে মানুষ কোটি কোটি মানুষের সংগীতের ক্ষুধা মিটিয়েছেন, তার পেটের ক্ষুধা মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যে মানুষ সুরের জাদুতে ভিজিয়েছেন অসংখ্য শ্রোতার মন, জীবনের খেরো খাতায় এখন তার প্রাপ্তি যেন শুধুই শূন্যতা। সেই অভিমান যেন ছুঁয়ে গেল এই শিল্পীকে। তিনি বলেন, ‘ভবের বাড়িতে মানুষকে শুধু গান শুনিয়ে গেলাম, কিন্তু আজ আমার ঘরে চাল নেই, ডাল নেই, মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে নিয়ে এসে খাই। আজও ঘরে রান্না হয়নি। পাশের বাড়ির আরেক ঘর থেকে ভাত দিয়ে গেছে।’

কাঙ্গালিনী সুফিয়ার ঘরের পাশেই রয়েছে তার একাডেমি । ছোট্ট একটি ঘরে থরে থরে সাজানো রয়েছে শিল্পীর বিভিন্ন ক্রেস্ট, সম্মাননা। দেয়ালে টানানো রয়েছে, একতারা হাতে গান গাওয়ার ছবিসহ বিভিন্ন ছবি। পুরো একাডেমি ঘুরিয়ে দেখালেন শিল্পীর মেয়ে পুষ্প।

একটু দূরেই রয়েছে গানের স্টেজ। তবে এই স্টেজ নিয়ে হতাশাও রয়েছে শিল্পীর। আক্ষেপ নিয়েই কাঙ্গালিনী সুফিয়া বলেন, ‘ঘরের পাশেই গানের স্টেজ। কিন্তু ছাদ নেই, বাউন্ডারি নেই। জিন্দা থাকতে দেখে যেতে পারলাম না। মইরা গেলে বাউন্ডারি কইরা দিলেই কী না দিলেই কী? দেখি তারেক রহমান আমারে বাউন্ডারি কইরা দেয় কি না।’

লালন শাহর মাজারের পাশে যেমন গানের জায়গা আছে, তেমনি কাঙ্গালিনী সুফিয়ার ইচ্ছে তার ঘরের পাশে স্টেজেও যেন গানের আসর বসে। অনেকটা আবেগী হয়ে শিল্পী বলেন, ‘আমি মরে যাওয়ার পরেও যেন ভক্তরা এখানে আসে।’

৩০টি জাতীয় এবং ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন কাঙ্গালিনী সুফিয়া। তবে জীবন সায়াহ্নে এসে সরকারের কাছ থেকে সম্মাননা চান এই শিল্পী। তিনি বলেন, ‘দেখি বর্তমান সরকার আমারে একুশে পদক দেয় কি না।’

জীবনের গোধূলি বেলায় এসে শরীর আর চলে না। দুর্দশার এই জীবনে আরও দুর্দশা বাড়িয়েছে ভাঙা হাত। কথা বলতে বলতে কখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। মা-মেয়ের সংসারে মেয়ে কখনো কাজের জন্য ঘরের বাইরে গেলে ভাঙা হাত নিয়েই সংসারের কাজ করতে হয় তাকে।

কাঙ্গালিনী সুফিয়ার শরীরে বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন রোগ। বয়সের কাছে হার মেনেছে কণ্ঠ। গান ছিল যে মানুষের জীবন, সেই গান গাইতে এখন আর কেউ ডাকে না তাকে। চোখভর্তি পানি নিয়ে শিল্পী বলেন, ‘আগের মতো কেউ গান গাইতে ডাকে না। যৌবন নাই রূপ নাই, বুড়া হয়ে গেছি। সবাই ভাবে আমার কাছে না এসে অন্যকে দিয়ে অনুষ্ঠান করাবে। এ জন্য এখন আর অনুষ্ঠানে ডাক পাই না।’

এদিকে মায়ের কষ্ট ছুঁয়ে গেছে মেয়ে পুষ্পকেও। কাঙ্গালিনী সুফিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় মেয়ে সাভার থেকে মাকে নিয়ে চলে এসেছেন এই বাড়িতেই। পুষ্প বলেন, ‘সাভারে বেশি থাকি। রাজবাড়ী কম থাকি। মায়ের শরীরের অবস্থা ভালো না। তাই মৃত্যুর আগে মাকে এখানে নিয়ে এসেছি।’

বসতঘর আর একডেমির মাঝখানে রয়েছে কাঁঠাল গাছ। সেই জায়গা দেখিয়ে পুষ্প বলেন, ‘এই যে খালি জায়গা দেখছেন, এখানেই মায়ের মাটি হবে।’ কাঙ্গালিনী সুফিয়া উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। এরপর এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর দেখতে আইসেন।’

হাতে টাকা নেই, ঘরে খাবার নেউ, কণ্ঠে গান নেই। শিল্পীর জীবনে যেন নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। চারপাশে এত মানুষ, তবু যেন কেউ নেই। শুধু শূন্যতা আর অসহায়ত্ব নিয়েই যেন বেঁচে আছেন একজন কাঙ্গালিনী সুফিয়া।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। ঘড়ির কাঁটায় ৪টা বাজে। এবার ঢাকা ফেরার পালা। শিল্পীর বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে নামল বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই কালবেলার গাড়ি ছুটছে ঢাকার দিকে। পেছনে চোখভর্তি পানি নিয়ে চেয়ে রইলেন কাঙ্গালিনী সুফিয়া। বৃষ্টি পানির সঙ্গে শিল্পীর চোখের পানি যেন মিলেমিশে একাকার; কিন্তু বৃষ্টির সাধ্য নেই ওই চোখের পানি ধুয়ে দেওয়ার। গাড়ি সাঁইসাঁই করে ছুটছে ঢাকার উদ্দেশে। মন খারাপ করে বসে আছি গাড়িতে। আহারে জীবন! বারবার কানের কাছে বাজতে লাগল শিল্পীর গাওয়া গানের লাইন—‘সুসময় দিন তো চলে, অসময়ে দিন চলে না/অসময়ে কেউ তো দেখে না।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরান সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মার্কিন নাগরিককে আটক করেছে ইসরায়েল 

ইলিশ নেই, খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা

বড় দুঃসংবাদ ব্রাজিলের, শেষ ষোলো থেকে ছিটকে গেলেন তারকা ফুটবলার

চূড়ান্ত হলো ব্রাজিলের শেষ ষোলোর প্রতিপক্ষ, ম্যাচ কবে-কখন

হালান্ডের জয়সূচক গোলে রাউন্ড অফ-১৬ তে নরওয়ে  

বিস্ফোরক মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেলেন এসএ পরিবহনের চেয়ারম্যান

প্রথমার্ধ শেষে ১-০ গোলে এগিয়ে ভাইকিংসরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট শিক্ষা অ্যাওয়ার্ড পেলেন ফেনীর মেয়ে সৈয়দা নুসরাত জাহান স্নেহা

ফরিদপুরে ৬ গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত ৩০, নিহত ১

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা

১০

কানাডা পশ্চিম বিএনপির সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি, স্থায়ী বহিষ্কারে কেন্দ্রে চিঠি

১১

ছাত্রদলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

১২

বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে হামলা, রেঞ্জারসহ আহত ১৬

১৩

শিশু নন্দিনী হত্যা, পলাতক আসামি মমতা গ্রেপ্তার

১৪

পালিত বলি মহিষে প্রাণ গেল কৃষকের

১৫

ট্রাম্পের জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব আদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাতিল

১৬

দুরন্ত ফ্রান্সকে হারানোর কঠিন মিশনে সুইডেন

১৭

চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষককে আবেগঘন বিদায় সংবর্ধনা

১৮

২ জুলাই শুরু হচ্ছে ১৯তম ‘অ্যাসেন্ট কর্পোরেট কাপ-২০২৬’

১৯

অবসরে গেলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৩ কর্মকর্তা

২০
X