কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম
আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে বাঙালিদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত

সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ অবস্থান করছে পুশ ইন হওয়া একটি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত
সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ অবস্থান করছে পুশ ইন হওয়া একটি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত

ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গের জাতিগত বাঙালিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে অভিযোগ তুলে উদ্বেগ জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির দাবি, কোনো মৌলিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই পুশইন হওয়া এসব মানুষদের অধিকাংশই মুসলিম।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর এমন পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অবস্থানের কারণে বহু পরিবার দুই দেশের সীমান্তের ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়েছে বলেও জানায় সংস্থাটি।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) এক বিবৃতিতে এমন উদ্বেগ জানায় মানবাধিকারভিত্তিক আন্তর্জাতিক এ সংস্থা।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যের বরাতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, গত ১ জুন থেকে বিএসএফের ২১টি ‘পুশ-ইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২০০ জনের বেশি মানুষকে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

মার্চ মাসের নির্বাচনের জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে’।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করে ভারত সরকার নির্মমভাবে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে।’

‘অবৈধভাবে মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া সরকারকে বন্ধ করতে হবে, প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং মুসলমানদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতা বন্ধ করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা রাতের বাংলাদেশের পুশইনের চেষ্টা করেছে— এমন ৯ প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর বিএসএফ শেষ পর্যন্ত সেসব মানুষদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে গত ৫ জুন বিএসএফ ১০ জনকে, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল, বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে ৭৫ ঘণ্টাব্যাপী এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পঞ্চগড়ের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী রুবেল হোসেন বলেন, ‘১০ জনের দলটি বাংলাদেশের প্রায় ৫০ ফুট ভেতরে চলে এসেছিল। স্থানীয়রা বিজিবিকে খবর দিলে তারা সেখানে আসে। এরপর তারা সরে গিয়ে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ একটি বাঁধের ওপর অবস্থান নেয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রথম রাতে তারা বজ্রপাত ও প্রবল বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কিছু শুকনো খাবার দেয়। পুরো পরিস্থিতি আমার কাছে যুদ্ধকালীন অচলাবস্থার মতো মনে হয়েছে। দুই বাহিনীর মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএসএফ দলটিকে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’

গত ৬ জুন ভোরে বিএসএফ দুই বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশের তেতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, দুইজন নারী ও একটি শিশু ছিল। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়, অন্যদিকে বিএসএফও তাদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। ফলে পরিবারগুলো সীমান্তে আটকা পড়ে। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর পর তাদের ভারতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়।

৮ জুন বিজিবি জানায়, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ঠাকুরগাঁও জেলার জিরো লাইনে আটকে থাকার পর বিএসএফ ১১ জনকে, যাদের মধ্যে এক গর্ভবতী নারী ও তার সন্তানও ছিল, ফেরত নিয়ে যায়।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্রুত ও বিতর্কিতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করে, যাতে ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়ে। এর ফলে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়। এর আগে ২০১৯ সালে আসামে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার বাংলাভাষী বাসিন্দাকে আটককেন্দ্রে রাখা হয়। অনেককে বেআইনিভাবেও বহিষ্কার করা হয়।

আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছে সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে যাই এবং একেবারে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই। এখন আসামে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে অনেক অবৈধ বাংলাদেশি নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’

বাংলাদেশের পঞ্চগড় সদর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাসিবুর ইসলাম বলেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরিবারটির সদস্যদের ভারতের আধার কার্ড ছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে এবং পরে সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দেয়। এরপর তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘পরিবারটির সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এ বছর তাদের কারও নাম ভোটার তালিকায় ছিল না। সীমান্তে তিন দিন আটকে থাকার পর তাদের ভারতে ফিরতে দেওয়া হয়।’

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে এবং তারা চাইলে দেশে ফেরার জন্য সহায়তা দেওয়া হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষাৎকারদাতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কাগজপত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক রাখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছে। এক ভারতীয় মানবাধিকারকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৪০০ মানুষ আটক রয়েছেন। অনেককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর আটক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বলেছে, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া কাউকে তারা গ্রহণ করবে না। নাগরিকত্ব যাচাই ও নির্ধারিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যেকোনো প্রত্যাবর্তন হতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি এবং সব ধরনের বর্ণবৈষম্য বিলোপসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের আওতায় ভারতের দায়িত্ব হলো সবার অধিকার রক্ষা করা এবং বর্ণ, বংশ, জাতীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না করা।

সংস্থাটি বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। খাবার, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা ছাড়া মানুষকে সীমান্তে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, বহিষ্কারের মুখোমুখি যেকোনো ব্যক্তির জন্য অভিযোগের ভিত্তি জানার অধিকার, আইনজীবীর সহায়তা এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত। শিশুদের বহিষ্কার বা সীমান্তে আটকে রাখা শিশু অধিকার সনদের পরিপন্থী, যেখানে শিশুদের নাগরিকত্ব রক্ষার অধিকার এবং তাদের স্বাধীনতা থেকে স্বেচ্ছাচারীভাবে বঞ্চিত না করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই ও নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের সুশৃঙ্খল হস্তান্তরের জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার ফলে বহু মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়ছে এবং তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘কোনো মানুষ—তার জাতীয়তা যাই হোক না কেন—দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটানোর মতো পরিস্থিতিতে ফেলে রাখা উচিত নয়। ভারতকে এই অমানবিক তাড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং উভয় সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সীমান্তে মানুষের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নগদ টাকা-মোবাইলসহ ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার

ইকরার মৃত্যু / যাহের আলভীর জামিন নাকচ, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

রিয়েল এস্টেট, হসপিটালিটি ও অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ দেশবন্ধু গ্রুপের

সব বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে : শিক্ষামন্ত্রী

কাঁঠাল থেকে সিঙ্গারা-সমুচা-কাবাব, পুষ্টিগুণও অনেক বেশি : কৃষিমন্ত্রী

গুম-নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনার বিচার চাইলেন হেফাজতকর্মী

প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নে বিশ্বাসী : সেতু প্রতিমন্ত্রী

‘গুপ্তধন’ ভেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্টারশেল বাসায় নিয়েছিলেন শ্রমিকরা

আধুনিক স্বাদে দেশি টুইস্ট, কেএফসি নিয়ে এলো ‘কারি ক্রাঞ্চ’

যে ৩ কারণে ভেস্তে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা

১০

আইসক্রিমপ্রেমীদের জন্য ‘সেভয়’র নতুন চমক 

১১

ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই খুন

১২

টেবিলে চিরকুট, কক্ষে ঝুলছিল শিক্ষকের দেহ

১৩

অবশেষে স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে ভোজিনহার, মাঠ থেকে সরাসরি দেখবেন মা

১৪

মুখে মাস্ক ও হেলমেট পরে মহাসড়কে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল

১৫

হাওরে বিলুপ্তির পথে দেশি প্রজাতির মাছ

১৬

নেত্রকোনার বজ্রপাতে ২ জনের মৃত্যু

১৭

জামায়াত আমিরের সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশনারের বৈঠক

১৮

অভিনেতা জাহের আলভী কারাগারে 

১৯

‘বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ’

২০
X