

দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গত এক মাসে কী পরিমাণ নিপীড়ন হয়েছে তা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট। এসব নিপীড়নকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিচারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে ‘ধর্ম যার যার- রাষ্ট্র সবার’ এ স্লোগান দিয়ে সাত দফা দাবিও জানিয়েছে তারা।
দাবিগুলো হলো—
১. গত এক মাসে (মে-জুন ২০২৬) দেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর সংঘটিত প্রতিটি হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
২. সিলেটে খগেন্দ্র দাস এবং শরীয়তপুরে শিক্ষক সুজিত কর্মকারকে আক্রমণকারীদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং মব জাস্টিস বন্ধে কঠোর আইন পাস করতে হবে।
৩. দেশের প্রতিটি মঠ, মন্দির ও শ্মশানের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভাঙচুর হওয়া মন্দিরগুলো রাষ্ট্রীয় খরচে পুনর্নির্মাণ করে দিতে হবে।
৪. ঠাকুরগাঁও ও শরণখোলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ও অগ্নিসংযোগের শিকার পরিবারগুলোকে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. সনাতন সম্প্রদায়সহ সব ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য একটি স্বাধীন 'সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন' গঠন করতে হবে।
৬. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে বা গুজব ছড়িয়ে (যেমন: শ্রীরামের ছবি অবমাননা বা মিথ্যা অপবাদ) দেশে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে তাদের সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
৭. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় কারণে শিক্ষকদের হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করা বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষক লাঞ্ছনাকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্ব আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক ঘোষিত ৩১ দফার 'রেইনবো নেশন' (রংধনু জাতি) চিন্তাধারাকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট প্রথম থেকেই একটি যুগান্তকারী ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে সাধুবাদ জানিয়ে আসছে। একটি বৈচিত্র্যময় ও সহনশীল সমাজ গঠনে এই রেইনবো নেশনের দর্শন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সরকারের এই ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ধূলিসাৎ করার জন্য একটি কুচক্রী মহল এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে মাঠে নেমেছে।
তারা হিন্দু সম্প্রদায়কে সফট টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করে দেশে একটি কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চায়, যার মূল উদ্দেশ্য বর্তমান সরকারকে নাজেহাল ও ব্যর্থ প্রমাণ করা। এই কৌশলগত ও পদ্ধতিগত নিপীড়নের বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরাই এই বর্ধিত প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য।
জাতীয় ৮ দফার প্রতি একাত্মতা ও সমর্থন
বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন কর্তৃক ধারাবাহিকভাবে উত্থাপিত যৌক্তিক ৮ দফা দাবির প্রতি বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট পূর্ণ সমর্থন ও একাত্মতা প্রকাশ করছে।
দাবিগুলো হলো-
১. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
২. সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন: দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন।
৩. সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়: সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট সমস্যা ও দাবিগুলো সমাধানের জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা।
৪. ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর: হিন্দু ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে একটি পূর্ণাঙ্গ হিন্দু ফাউন্ডেশনে' (বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের জন্যও সমমানের প্রতিষ্ঠান) রূপান্তর করা।
৫. দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ: মন্দির ও দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার্থে নতুন আইন প্রণয়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন।
৬. দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও হোস্টেলে সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় আচার পালনের জন্য পৃথক প্রার্থনার কক্ষ বা স্থানের ব্যবস্থা করা।
৭. সংস্কৃত ও পালি শিক্ষার আধুনিকীকরণ: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন।
৮. ছুটি বৃদ্ধি: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি বাড়িয়ে পাঁচ দিন করা।