

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ ঠেকাতে সক্রিয়ভাবে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে উত্তেজনা কমাতে চাপ সৃষ্টি না করত, তাহলে গত মঙ্গলবার জেনেভায় সর্বশেষ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকটি সম্ভব হতো না।
রিয়াদ, আঙ্কারা ও দোহা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকার অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য শুধু শান্তির আহ্বান নয়; বরং নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। তারা মনে করে সীমিত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে তা সামলানো যাবে না। তুরস্ক, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও মিশর আলোচনার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে এবং উত্তেজনা বাড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। ইরানও ইঙ্গিত দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে পুরো অঞ্চল জড়িয়ে পড়তে পারে—এভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসতে বাধ্য করছে। এই দেশগুলোর সম্পর্ক ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের চেয়ে ঘনিষ্ঠ। তবে তারা ইরানের প্রতি সহানুভূতি থেকে নয়, নিজেদের ঝুঁকির কথা ভেবেই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে।
মধ্যস্থতাকারী ও অংশীদাররা: ওমান সবচেয়ে দৃশ্যমান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। তারা আলোচনা আয়োজন করেছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। ওমান বারবার পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের ঝুঁকির কথা বলেছে। কাতারও জটিল অবস্থানে রয়েছে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি আল উদেইদ অবস্থিত, আবার ইরানের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক রয়েছে। তারা বলছে, যুদ্ধ হলে তা হবে ‘ভয়াবহ’। তাদের গ্যাস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে ক্ষতি হবে।
সৌদি আরব, যারা আগে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত ছিল, এখন তারা তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান উত্তেজনা এড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। ২০১৯ সালে আরামকো স্থাপনায় হামলার মতো ঘটনা তাদের তেল অবকাঠামোর ঝুঁকি দেখিয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ হলে তাদের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মিশর সরাসরি সীমান্তবর্তী না হলেও ঝুঁকিতে রয়েছে। সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ তাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ হলে বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।
তুরস্কের ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ: যারা ইরানের প্রতিবেশী এবং অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত, এই আঙ্কারাও উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়িয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ তারা চায় না। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সামরিক হামলা ইরানের সরকারকে সরাতে পারবে না এবং পারমাণবিক সমস্যা সমাধান করবে না। তবে ন্যাটো সদস্য হওয়ায় তুরস্কের অবস্থান সীমিত। যুদ্ধ হলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে কিছুটা সমন্বয় রাখবে।
যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও এর জন্য প্রস্তুত: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—তারা নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, আবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে। যুদ্ধ হলে তেলের দাম বাড়তে পারে, যা সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশকে সাময়িকভাবে লাভ দিতে পারে। কিন্তু অবকাঠামোতে হামলা, হরমুজ প্রণালি বা সুয়েজ খালে বাণিজ্য বাধা এবং বিনিয়োগকারীদের পুঁজি সরিয়ে নেওয়ার মতো ঝুঁকি অনেক বেশি। এ কারণেই তারা একদিকে যুদ্ধ ঠেকাতে চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হলে তারা সরাসরি জড়াতে চাইবে না, তবে নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় রাখবে।