

রাজধানীতে একটি ম্যারাথন প্রতিযোগিতা চলাকালে দৌড়াতে দৌড়াতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এক প্রতিযোগী। সংকটময় সেই মুহূর্তে চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক সিপিআর, জরুরি চিকিৎসা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিরে আসে আশার আলো।
পুরো ঘটনাটি নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবেগঘন একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন চিকিৎসক ডা. উজ্জ্বল কুমার মল্লিক।
নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া সেই চিকিৎসকের পোস্টটি কালবেলার পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
আজ আমি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি… আর দেখেছি, মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জীবন কীভাবে আবার ফিরে আসতে পারে।
আজ সকালে প্যান্টোনিক্স টাইগার রান-এর প্রাণবন্ত আয়োজনে হাজারো রানারের উচ্ছ্বাসের মাঝেই হঠাৎ সবকিছু থমকে যায়। আমাদের প্রিয় রানার সুব্রত কুমার দৌড়াতে দৌড়াতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। খবর আসে- তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত।
দৌড়ের উৎসব মুহূর্তেই পরিণত হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ে।
আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টিম ইতোমধ্যে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। নিজেকে পরিচয় দিয়ে আমি রিসাসিটেশন টিমে যুক্ত হই। রোগীকে পরীক্ষা করে দেখি- ক্যারোটিড পালস নেই, রক্তচাপ নেই, স্বতঃশ্বাস নেই। মনে হচ্ছিল, জীবন যেন নিঃশব্দে দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু একজন চিকিৎসকের কাছে শেষ মুহূর্ত বলে কিছু নেই।
আমরা সবাই মিলে শুরু করি মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক নিরলস যুদ্ধ। চলতে থাকে বুকে বুক মিলিয়ে সিপিআর, এয়ারওয়ে ম্যানেজমেন্ট, ব্যাগ-মাস্ক ভেন্টিলেশন, অক্সিজেন, শিরাপথে ওষুধ ও ফ্লুইড। তারপর দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরের সেই ২০-২৫ মিনিট আমার চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়গুলোর একটি।
প্রতিটি বুক চাপড়ে দেওয়া, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি ওষুধ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত- শুধু একটি প্রার্থনা নিয়ে ছিল…
“হে সৃষ্টিকর্তা, আরেকবার… শুধু আরেকবার হৃদয়টা স্পন্দিত হোক।”
এক পর্যায়ে ব্যাগ-মাস্ক ভেন্টিলেশন যথেষ্ট হচ্ছিল না। চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সেই আমরা জরুরি ইন্টুবেশন করি। জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা এক মুহূর্তের জন্যও থামাইনি। কারণ আমরা জানতাম- যতক্ষণ আমরা লড়ছি, ততক্ষণ আশা বেঁচে আছে।
হাসপাতালে পৌঁছে আইসিইউ টিমের হাতে রোগীকে হস্তান্তর করি। তারা পূর্বপ্রস্তুত অবস্থায় দ্রুত পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করেন। আল্লাহর অসীম রহমত, পুরো মেডিকেল টিমের দক্ষতা এবং অসংখ্য মানুষের দোয়ায় আজ সুব্রত কুমারের অবস্থার উন্নতির সংবাদ আমাদের হৃদয়ে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
আজকের এই ঘটনা আমাকে আবারও শিখিয়েছে-
একজন রানার শুধু নিজের জন্য দৌড়ায় না; তার জন্য দৌড়ায় একটি পরিবার, অসংখ্য বন্ধু, আর প্রয়োজনে অজস্র অচেনা মানুষও।
আজ আমরা কেউ একা ছিলাম না। একজনের জীবন বাঁচাতে চিকিৎসক, ইন্টার্ন, প্যারামেডিক, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স কর্মী- সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম। এই ঐক্যই চিকিৎসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
আমাদের প্রিয় ভাই সুব্রত কুমারের জন্য সবাই আন্তরিকভাবে দোয়া করবেন। মহান আল্লাহ যেন তাকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করেন এবং আবারও সুস্থ হৃদয়ে, হাসিমুখে, ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর শক্তি ফিরিয়ে দেন।
শেষে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরো মেডিকেল টিমকে। আজকের এই লড়াইয়ে আমরা শুধু একজন রোগীকে চিকিৎসা করিনি—আমরা একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং আশাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি।
জীবনের চেয়ে বড় কোনো বিজয় নেই।
আজকের সবচেয়ে বড় মেডেল- একটি স্পন্দিত হৃদয়।
লেখক: ডা. উজ্জ্বল কুমার মল্লিক। সহকারী অধ্যাপক, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, আগারগাঁও, ঢাকা।