

ইউরোপ প্রচলিত যে কোনো বিবেচনায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কোনো পক্ষ নয়। ইউরোপীয় সেনারা ইরানি মালভূমিতে হামলা করছে না, তাদের যুদ্ধবিমানগুলোও তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে আছড়ে পড়ছে না। তবু এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত অভিঘাত এরই মধ্যে ইউরোপে অনুভূত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সাধারণত আঞ্চলিক সীমায় আটকে থাকে না; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং অভিবাসন প্রবাহের মাধ্যমে দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথম বড় সমস্যা হলো ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে একক অবস্থান নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কূটনৈতিকভাবে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে; কিন্তু সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক পশ্চিমা নিরাপত্তার জন্য হুমকি। জার্মানির ঐতিহাসিক নীতির অংশ হিসেবে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগের সমর্থন তার অবস্থানে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং এ হামলাকে উত্তেজনা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করতে পারে এবং লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই দুই ভিন্ন অবস্থান ইউরোপের একটি বড় বাস্তবতাকে তুলে ধরে—মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে তাদের কোনো একক কৌশল নেই।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইউরোপ বড় চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে ইউরোপ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার কমানোর পরিকল্পনাও কঠিন হয়ে উঠবে।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সম্ভাব্য শরণার্থী সংকট। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব বড় সংঘাতের পর ইউরোপে শরণার্থীর ঢল দেখা গেছে। ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি; সংঘাত বিস্তৃত হলে তাদের একটি অংশ আশ্রয়ের সন্ধানে ইউরোপে যেতে পারে। এতে ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থা বড় চাপের মুখে পড়বে।
অভিবাসন প্রশ্নটি ইউরোপে দ্রুত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর থেকেই এ বিষয়ে জনমত বিভক্ত। নতুন করে শরণার্থী প্রবাহ বাড়লে কট্টর ডানপন্থি ও জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক দলগুলো আরও শক্তিশালী হতে পারে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকলেও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সম্ভাব্য শরণার্থী সংকট, রাজনৈতিক মেরূকরণ এবং পশ্চিমা জোটের ভেতরে মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে এই সংঘাত ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। আগামী সময়ই বলে দেবে, ইউরোপ এ সংকট মোকাবিলায় ঐক্য বজায় রাখতে পারবে কি না।