বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:০২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

‘ইরান জলাভূমিতে’ আটকা যুক্তরাষ্ট্র

এশিয়াটাইমসের বিশ্লেষণ
‘ইরান জলাভূমিতে’ আটকা যুক্তরাষ্ট্র

ইসরায়েলের উসকানিতে যুদ্ধে পা দিয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র। ভেবেছিলেন—কয়েকদিনেই বিজয় ঘোষণার রসদ পেয়ে যাবেন তিনি। তবে দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলে যুদ্ধের ফাঁদে ফেলে ইরান। অভাবনীয় জবাব দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে তেহরান। ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সেনাদের ঝোড়ো হামলায় নাস্তানাবুদ প্রতিপক্ষ। কখনো বিজয় দাবি করছেন, কখনো যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবুও তেহরান এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে আক্রমণ বাড়িয়ে চলেছে। মূলত কূটনীতি উপেক্ষা করে যুদ্ধ শুরু করা যুক্তরাষ্ট্র এখন এ সংঘাত থেকে বের হতে মরিয়া হলেও সে পথ কঠিন করে তুলছে ইরান। এ ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের ব্যর্থতা এবং ইরানের জলাভূমিতে আটকা পড়ার মতো ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন এশিয়টাইমসের বিশ্লেষক ও গ্লোবাল জাইটগাইস্টের লিওন হাদার।

বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের উসকানিতে যুদ্ধের ফাঁদে পড়া ওয়াশিংটনের লক্ষ্য স্পষ্ট না হওয়ায় এখন তারা বিজয় দাবির রসদও পাচ্ছে না। এদিকে নিজ সেনাদের প্রাণহানি, সামরিক অতি ব্যয়, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, বাণিজ্য ব্যাহত ও তেল সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চাপেও পড়েছেন ট্রাম্প। আর কূটনৈতিক সমাধান উপেক্ষা করে যুদ্ধ শুরু করায় সে পথও আটক দেওয়ার চেষ্টা করছে তেহরান। এর মধ্যে ইরানকে কৌশলগতভাবে সহায়তা করছে প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়া। পাশাপাশি তারা আর্থিক সুবিধা নিয়ে শক্তিশালীও হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বহু বছর ধরে একটি বড় সমস্যা রয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে অতি জড়িয়ে পড়া। বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এ ধরনের নীতি একদিন বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। এখন সে আশঙ্কাই বাস্তবে ঘটছে।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি হামলা চালানো হয়। এ হামলার কারণ নিয়ে মার্কিন প্রশাসন একেক সময় একেক কথা বলেছে—কখনো বলা হয়েছে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি ঠেকাতে, কখনো বলা হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বন্ধ করতে, আবার কখনো বলা হয়েছে শাসন পরিবর্তনের জন্য। এত ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া মানে আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়।

এ যুদ্ধের মূল্য এরই মধ্যে দিতে শুরু করেছে সবাই। কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবেও মার্কিন সেনারা আক্রান্ত হয়েছেন। ইরাকে একটি বিমান দুর্ঘটনায় আরও ছয় সেনা প্রাণ হারান। এসবই দেখায় যে যুদ্ধ শুধু শুরু হয়, কিন্তু শেষ করা কঠিন।

এ সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, অনেক ফ্লাইট বন্ধ হয়েছে। সমুদ্রপথেও বড় প্রভাব পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তিন হাজারের বেশি জাহাজ আটকে আছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকের মতে, এ পরিস্থিতির একটি বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ছিলেন, তিনি বলেছেন যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পারমাণবিক আলোচনা এগোচ্ছিল। কিন্তু এ যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে নষ্ট করেছে।

এমনকি কিছু কূটনীতিক অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন প্রতিনিধিরা ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছিলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নাকি আশঙ্কা করছিলেন যে আলোচনা সফল হয়ে যাবে, তাই তিনি যুদ্ধের জন্য চাপ দেন।

এ ঘটনাগুলো ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রয়েছে। তখনো কূটনৈতিক পথ ছিল, কিন্তু তা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে যুদ্ধ শুরু করা হয়।

সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো, এ মার্কিন প্রশাসন ক্ষমতায় এসেছিল যুদ্ধ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু এখন তারা মধ্যপ্রাচ্যে আবার বড় আকারে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে—বিমানবাহী রণতরি, বোমারু বিমান এবং নজরদারি বিমান মোতায়েন করেছে। এতে মার্কিন সামরিক শক্তি অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে, বিশেষ করে এশিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে চীন। তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়ায় বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা জরুরি ছিল। কিন্তু লিওন হাদার এ যুক্তির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইএইএ) তখনো নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল। তার মতে, শুধু বোমা হামলা করে কোনো দেশের আচরণ পরিবর্তন করা যায় না। পরিবর্তন আসে কূটনীতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার মাধ্যমে। ইরানকে সাময়িকভাবে দুর্বল করা গেলেও ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে—নতুন নেতৃত্ব, নতুন সামরিক শক্তি এবং জনগণের ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তিনি ‘ধ্বংসাত্মক বিচ্ছিন্নতা’ নামে একটি ধারণার কথা বলেন। এর মানে হলো—যুক্তরাষ্ট্র একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে জড়িয়ে আছে, আবার অন্যদিকে সঠিকভাবে পরিস্থিতি সামলাতেও পারছে না। ফলে সমস্যা আরও বাড়ছে।

এর বিপরীতে তিনি ‘গঠনমূলক বিচ্ছিন্নতা’র কথা বলেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ না করে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াত, ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখত, ইউরোপের সঙ্গে মিলে পারমাণবিক চুক্তি করত এবং বুঝত যে, ইরানকে সম্পূর্ণ শত্রু হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা উচিত।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং রাজনৈতিক চাপ, ইসরায়েলের উদ্বেগ এবং নেতাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে একটি সম্ভাবনাময় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়েছে।

এর মধ্যে ২০ মার্চ ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, তিনি হয়তো যুদ্ধ কমাতে চান। তবে বিশ্লেষক মনে করেন, এখন শুধু যুদ্ধ থামানোই যথেষ্ট নয়—এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

বর্তমানে পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব অজানা এবং পুরো অঞ্চল অস্থির। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছে। এ প্রেক্ষাপটে লিওন হাদার বলেন, তিনি বহু বছর ধরে এ বিপদের কথা বলে আসছেন, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা সত্যি হয়েছে। এ যুদ্ধ কারও জন্যই জয় নয়—এটি শুধু মানুষের প্রাণহানি এবং ধ্বংস ডেকে এনেছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার ধৈর্য, বাস্তববাদী চিন্তা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ। এ যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে পুরোনো ভুল নীতি এখনো পরিবর্তন হয়নি। আর সে কারণেই একই ধরনের বিপর্যয় বারবার ফিরে আসছে।

কালবেলা/পিআর
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সেই ইকনের পড়ালেখার দায়িত্ব নিচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী

‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনই আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়’

ব্রাহ্মণপাড়ায় ৩২ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে সংসদে আলোচনা হবে: ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চোর সন্দেহে প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যা: সাভারে ৩ আসামির একদিনের রিমান্ড

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকের বিরোধের জেরে ধর্ষণ মামলা

বিশ্বকাপের সেরা একাদশ ঘোষণা করল ফিফা, জায়গা পেলেন যারা

নারায়ণগঞ্জে চুরির মামলায় শ্রমিকদল নেতা গ্রেপ্তার

৪৯তম বিশেষ বিসিএস: দুই প্রার্থীর ফল ও সাময়িক নিয়োগ বাতিল

বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল অটোরিকশার ২ যাত্রীর

১০

টানা বৃষ্টিতে মরিচের বাজারে আগুন

১১

লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে রেডিওতে সতর্কবার্তা দিচ্ছে হুতিরা

১২

আধুনিক মেশিনে বদলে যাচ্ছে রামেক হাসপাতালের ল্যাব সেবা

১৩

হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

১৪

ফেনীতে আ.লীগের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

১৫

মেসিদের নিয়ে অপপ্রচার, কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে আর্জেন্টিনা

১৬

দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই: পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি

১৭

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্যেও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে ইরান

১৮

স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় কারাগারে স্ত্রী

১৯

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ / কমলগঞ্জে সেই ১২০০ কমলা গাছ কাটার ঘটনায় উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন

২০
X