

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের চার সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, দুই দেশের মধ্যে ‘ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে এবং শিগগির একটি সমাধান হতে পারে। তবে তেহরান এ দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র কড়া ভাষায় বলেছেন, ‘আপনার পরাজয়কে কোনো চুক্তি বলে চালাবেন না।’ এর ফলে বোঝা যাচ্ছে যে, দুই দেশের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা সহজে কোনো সমঝোতায় আসবে না। তাদের মতে, অঞ্চলের স্থিতিশীলতা তাদের শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। তারা আরও বলেছে, আগের অবস্থায় কিছুই ফিরে যাবে না যতক্ষণ না তারা নিজেরা তা চায়। এমনকি তারা এটাও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখন বা ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতার প্রশ্নই ওঠে না।
অন্যদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি সাময়িকভাবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, আলোচনা চলছে এবং ইরানও একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে ইরান আবার বলছে, কোনো আলোচনা চলছে না। এ বিরোধপূর্ণ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনার দায়িত্বে আছেন। একই সময়ে খবর এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় তিন হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—যদি সত্যিই শান্তি আলোচনা চলে, তাহলে কেন সেনা মোতায়েন বাড়ানো হচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের চাপ তৈরির কৌশল, যাতে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসানো যায়।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সরিয়ে দিলে দেশটির ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আরও জোরালোভাবে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে।
সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ে, কারণ তার মিত্র দেশগুলো যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি জানাতে শুরু করে।
দেশের ভেতরেও ট্রাম্প চাপের মুখে পড়েছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তা কমে গেছে। তিনি নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বন্ধ করবেন। তাই এখন তিনি বড় আকারে স্থলযুদ্ধে জড়াতে চান না।
ইসরায়েল এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতিতে খুব আগ্রহী নয়, কিন্তু ট্রাম্প বুঝতে পারছেন যে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাকে এমন একটি সমাধান বের করতে হবে, যা তিনি নিজের সাফল্য হিসেবে দেখাতে পারবেন। কিন্তু ইরান সেই পথ সহজ করছে না।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফা শর্ত দিয়েছে, যা মূলত আগের প্রস্তাবের মতোই। ইরান এক বছর আগেই এমন শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছিল। এখন তারা আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে, কারণ তারা এতদিন ধরে টিকে থাকতে পেরেছে।
ইরান এখন মনে করছে, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তারা আরও ভালো শর্ত আদায় করতে পারবে। তারা চায় এমন একটি চুক্তি, যা ভবিষ্যতে তাদের ওপর আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা দেবে। কারণ, গত এক বছরে তারা দুবার বড় আক্রমণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া তাদের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর সরকার দুর্বল দেখাতে চায় না।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় ইরান সময় নিয়ে দরকষাকষি করতে চাইছে। তবে ইরানের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি সুবিধাজনক নয়। এ যুদ্ধে এরই মধ্যে দেড় হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে, অনেক শহর ধ্বংস হয়েছে এবং অর্থনৈতিক সংকট বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া দেশের ভেতরে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষও বাড়ছে। সরকার প্রায় ৯ কোটি মানুষের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে, যা ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনে বড় সমস্যা তৈরি করেছে। অনেক ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে—গত সপ্তাহে তারা বেশ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ ছিল। সরকার সতর্ক করেছে যে, কেউ রাস্তায় বিক্ষোভ করলে তাকে ‘শত্রু’ হিসেবে গুলি করা হবে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই জটিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চায়, অন্যদিকে ইরান আরও শক্ত অবস্থান নিয়ে ভালো চুক্তির জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। তাই অদূরভবিষ্যতে এ সংঘাতের সমাধান হওয়া কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।