বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্য সংকট

ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতিতে কেউ জিততে পারবে না

এশিয়া টাইমসের নিবন্ধ
ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতিতে কেউ জিততে পারবে না

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে বুঝতে একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যায়—ইরানের বিরুদ্ধে ‘জয়’ আসলে কেমন হবে? যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের দৃষ্টিতে এর উত্তর সাধারণত খুব স্পষ্ট শোনায়—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, তার আঞ্চলিক প্রভাব ভেঙে দেওয়া, এমনকি শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। এগুলো এমন ভাষা, যা একটি নির্দিষ্ট শেষ লক্ষ্যসহ যুদ্ধের কথা বলে।

কিন্তু তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন। ইরানের জন্য ‘জয়’ মানে শুধুই টিকে থাকা। এ পার্থক্যই পুরো সংঘাতের চরিত্র নির্ধারণ করে দিয়েছে। এমন যুদ্ধগুলোতে যে পক্ষের জয়ের শর্ত কম, তারা প্রায়ই এগিয়ে থাকে। বর্তমানে ইরানের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে কম—তাদের শুধু টিকে থাকতে হবে।

সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্পষ্ট প্রাধান্য রয়েছে। তারা অত্যন্ত নিখুঁত ও দূরপাল্লার হামলা চালাতে সক্ষম এবং বহুবার তা দেখিয়েছে। তারা অবকাঠামো, সামরিক নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

তবু এসব কৌশলগত সাফল্য রাজনৈতিক ফলে রূপান্তরিত হয়নি। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। তাদের সরকার এখনো কার্যকর এবং তাদের সামরিক ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এমনকি তাদের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো যেমন পারমাণবিক জ্ঞান—এখনো অক্ষত আছে।

মূল ভুলটি হলো ধরে নেওয়া যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই কৌশলে খেলছে। বাস্তবে তা নয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে সরাসরি হারানোর চেষ্টা করছে না। বরং তারা সময়ক্ষেপণ করতে চায়, প্রতিপক্ষের লক্ষ্যগুলো জটিল করে তুলতে চায় এবং যুদ্ধের খরচ এত বাড়াতে চায় যাতে তা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই কৌশল পুরো সংঘাতে স্পষ্ট। যুদ্ধ শুধু সরাসরি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে পড়েছে জাহাজ চলাচলের পথ, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের মধ্যে। হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করার উপায়।

ইরানের লক্ষ্য সরাসরি আধিপত্য নয়, বরং জটিলতা তৈরি করা। তারা জানে, যদি তারা প্রতিপক্ষকে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে রাখতে পারে, যা খুব ব্যয়বহুল এবং সমাধান করা কঠিন, তাহলে তাদের সামরিকভাবে জেতার প্রয়োজন নেই।

যখন কোনো যুদ্ধ স্থবির হয়ে যায়, তখন সাধারণত আরও শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা দেখা যায়—বেশি বোমা হামলা, জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত, এমনকি স্থল বাহিনী মোতায়েন। ধারণা থাকে, এতে ফল বদলাবে।

কিন্তু ইরান কোনো নিষ্ক্রিয় লক্ষ্য নয়। তারা এরই মধ্যে দেখিয়েছে যে, তারা পাল্টা আঘাত হানতে পারে। তাদের প্রতিক্রিয়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমানসহ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে তা পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তি অনুমান করা যাচ্ছে, তারা এরই মধ্যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। ফলে যুদ্ধ বাড়ানোর প্রশ্ন এখন শুধু ইচ্ছার নয়, সক্ষমতারও।

এ সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানির অবকাঠামোতে হামলা হতে পারে। এতে গরমের সময় অঞ্চলটির জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠবে এবং ব্যাপক মানুষ স্থানচ্যুত হতে পারে।

তবু মূল বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকে। ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তা দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠবে। আসল সমস্যা হলো—এ যুদ্ধে এমন কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই যা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করা সম্ভব।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য পুরোপুরি এক নয়। ইসরায়েল সম্ভবত ইরানের ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে দিতে চায়, এমনকি সরকার পরিবর্তন পর্যন্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কখনো চাপ সৃষ্টি, কখনো নিয়ন্ত্রণ, কখনো আলোচনার পথে হাঁটে।

এই পার্থক্য কৌশলগত। যখন যুদ্ধের লক্ষ্য এক নয়, তখন সেই যুদ্ধ থেকে স্পষ্ট বিজয় আসা কঠিন। বরং যা হয় তা হলো—ক্রমাগত সামরিক কার্যক্রম, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত ফল নয়।

এখন পরিস্থিতি এমন যে, এটি আর এমন কোনো যুদ্ধ নয় যা দ্রুত শেষ হবে। বরং এটি একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ঢুকে পড়েছে—হামলা, বিরতি, সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং সীমিত অগ্রগতির আলোচনা।

এ যুদ্ধবিরতিগুলো আসলে অগ্রগতির চিহ্ন নয়, বরং সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র চায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বড় আকারে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে। অন্যদিকে ইরান জানে যে, সময় তাদের পক্ষে কাজ করছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠছে, সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ছে এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যা শুরু হয়েছিল একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে, তা এখন বৈশ্বিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ছোট একটি বিঘ্নও বড় অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে আসল প্রশ্ন—কারা এগিয়ে?

সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এগিয়ে। কিন্তু যুদ্ধ শুধু শক্তির ওপর নির্ভর করে না। লক্ষ্য, খরচ এবং সময়—এই তিনটির সমন্বয়ে ফল নির্ধারিত হয়।

এদিক থেকে ইরান তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে আছে। তাদের লক্ষ্য সীমিত, তারা দীর্ঘ সময় চাপ সহ্য করতে পারে এবং তারা প্রতিপক্ষের ওপর খরচ চাপিয়ে দিতে সক্ষম।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরানের জেতার প্রয়োজন নেই। তাদের শুধু প্রতিপক্ষকে জিততে না দেওয়াই যথেষ্ট।

সুতরাং যদি ‘জয়’ বলতে বোঝানো হয় ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা, তাহলে সেটি সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যা করতে পারে তা হলো এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়া এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু সেটি কোনো বিজয় নয়—এটি শুধু টিকে থাকা।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এই বিশ্বাস যে, আরও চাপ বা আরও সময় দিলে ফল বদলাবে। যদি সেই বিশ্বাস ভুল হয়, তাহলে এই যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না—এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী, অনির্দিষ্ট সংঘাতে পরিণত হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শত্রুরা ইরানের জনগণের মনোবল ভাঙার চেষ্টা চলছে : মোজতবা খামেনির

মোগলহাট স্থলবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার : চেয়ারম্যান

‘জামায়াত নেতার বেদে মেয়েদের চুল কেটে দেওয়ার’ দাবিটি ভুয়া

কক্সবাজারে মাটিচাপায় দুই শ্রমিক নিহত

উন্নয়ন বরাদ্দের তালিকায় অস্তিত্বহীন মসজিদ, বিএনপি নেতাকে শোকজ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে : স্টেফান লিলার

ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ডিএসসিসির ৬৩ ওয়ার্ড, ২৭টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা’ সংক্রান্ত সভা

থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পেটানো সেই ওসি প্রত্যাহার, মামলার প্রস্তুতি

১০

এনসিপির এক কমিটির কার্যক্রম স্থগিত

১১

নির্বাচনের আগেই তারা আমাকে হারিয়ে দিয়েছিল : মির্জা ফখরুল

১২

বিশ্বকাপের ভেন্যুতে নিষিদ্ধ হলো পানির বোতল

১৩

নতুন চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার পেল বিএসইসি

১৪

একাকী অনুশীলন করছেন মেসি

১৫

বিএসইসির চেয়ারম্যান হলেন ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মাসুদ খান

১৬

নেইমার নাকি ভিনি, ১০ নম্বর জার্সি কার

১৭

মার্কিন নাগরিককে ধরে নিয়ে গেছে ইসরায়েলি বাহিনী

১৮

বিশ্বকাপ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করল অপ্টা

১৯

জবানবন্দিতে দোষ স্বীকার / রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা ও নিজের পালিয়ে যাওয়ার বর্ণনায় যা জানালেন সোহেল

২০
X