

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রায় চূড়ান্ত। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এবারের ইশতেহার প্রণীত হচ্ছে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ, নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া তারেক রহমানের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে। ইশতেহারে তরুণ, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পাবে। আর দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিই হবে মূল লক্ষ্য। নতুন ভোটারদের কাছে টানতে বিশেষ কর্মসূচিও থাকছে ইশতেহারে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়টি সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইশতেহার ঘোষণার জন্য প্রথমে ১ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্য ছিল বিএনপির। তবে দলের চেয়ারম্যানের বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া নানান প্রতিশ্রুতিসহ দু-একটি বিষয় ইশতেহারে শেষ মুহূর্তে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সে কারণে ইশতেহার ঘোষণার তারিখও পিছিয়ে দেওয়া হয়। চলতি সপ্তাহেই তা ঘোষণা করা হবে। তবে সেটা ২ অথবা ৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল দুজন নেতা কালবেলাকে জানান, কিছু জিনিস বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখনো নিজের কাছে রেখেছেন। আশা করছেন, সেটা তারা দ্রুতই পেয়ে যাবেন। এরপর সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেই চূড়ান্ত হওয়া ইশতেহার শিগগির ঘোষণা করা হবে। রাজধানীর একটি হোটেলে বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। তবে ইশতেহারের স্লোগান এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’সহ কয়েকটি স্লোগান বিবেচনায় রয়েছে দলটির।
জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিএনপির মূল প্রতিশ্রুতি মূলত আটটি। সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশবান্ধব নীতিমালা এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবমুখী এসব কর্মসূচি দলটি এরই মধ্যে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেছে। ইশতেহারে এগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া সুদসহ কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ভারতের ফারাক্কার বিপরীতে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ অঞ্চলভিত্তিক বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নানা প্রতিশ্রুতিও থাকছে ইশতেহারে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনী শাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির অঙ্গীকার।
বিএনপি নেতারা আশা করছেন, ৩১ দফা, জুলাই সনদ ও টার্গেট গ্রুপভিত্তিক প্রতিশ্রুতি—এ তিনের সমন্বিত ইশতেহার তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন গতি এনে দেবে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ কালবেলাকে বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি আমরা এরই মধ্যে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করেছি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে এগুলো গুরুত্ব পাবে। শিগগির এ ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির এ নির্বাচনী ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের ভেঙে পড়া রাষ্ট্র কাঠামো ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং সাংবিধানিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করা; সর্বোপরি দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা।
সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি। দলটির এ ৩১ দফার মূল বিষয় হিসেবে ইশতেহারে অবাধ নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে।
দলটির ইশতেহারে কওমি মাদ্রাসা উন্নয়ন, ইসলামিক গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন, ধর্মচর্চার বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন না করার অঙ্গীকার থাকছে। ইশতেহারে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নিরাপত্তা সেল, উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর কার্যক্রম চালুর প্রতিশ্রুতি যুক্ত হবে। তারেক রহমান কিছুদিন আগে এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।’
যুবসমাজকে টার্গেট করে বিএনপি বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে ইশতেহারে। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারে গেলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি নতুন চাকরি, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার ও মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স। তারেক রহমানের ভাষায়, নতুন বাংলাদেশ গড়বে যুবসমাজ; চাকরির সংকট নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সুযোগ সৃষ্টি করবে বিএনপি।
কৃষি ও কৃষককে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার চূড়ান্ত করছে বিএনপি। এর মধ্যে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিঋণ সহজ করা এবং ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকবে। তারেক রহমান কিছুদিন আগে বলেছেন, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফসল বিক্রি করবে, এটা আর হবে না।
নারী নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল—এগুলোও ইশতেহারের অংশ হচ্ছে। এ ছাড়া ইশতেহারে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিএনপির আট মূল প্রতিশ্রুতি। দলের ঘোষিত এই আট অগ্রাধিকারভিত্তিক সামাজিক নীতির কাঠামো এরই মধ্যে কূটনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের জানিয়েছে বিএনপি। সেখানে দলটি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড কীভাবে এগিয়ে নেবে, তা বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ‘পলিসি ডিসেমিনেশন অন প্রায়োরিটি সোশ্যাল পলিসিজ’ শীর্ষক আলোচনায় এই আটটি খাতের ওপর আলোকপাত করে বিএনপি। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়াসহ ৩০ দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমান এর আগে লন্ডনে অবস্থানকালে সেখান থেকে ভিডিওবার্তা ও ভার্চুয়াল আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের কথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের বিভিন্ন পোস্ট এবং দেশব্যাপী চলমান নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া তার বক্তব্যে দলীয় রাষ্ট্রের অবসান, গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দলীয় সূত্র বলছে, এসব দিকই ইশতেহারের চূড়ান্ত ভাষায় প্রতিফলিত হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী কালবেলাকে বলেন, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করছে বিএনপি। শুনেছি, দু-একদিনের মধ্যে তা ঘোষণা করা হতে পারে।
মন্তব্য করুন