

দুই দশক কারাবাসের পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে বেরিয়ে আসেন এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন। জামিনে বেরিয়েই পুলিশের খাতায় লাপাত্তা হয়ে যান তিনি। তবে ক্রমেই অপরাধের অন্ধকার সাম্রাজ্যে সক্রিয় হচ্ছিলেন। কারাগারে থাকার কারণে হারিয়ে ফেলা প্রভাব পুনরুদ্ধারে নামেন তিনি। চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজিতেও তার নাম আসতে থাকে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বরূপে ফেরা হয়নি।
গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিউমার্কেটের বটতলা সংলগ্ন সড়কে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মোটরসাইকেলে আসা দুজন অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে অন্তত ৫ রাউন্ড গুলি করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল বুধবার এ ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় তার ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাতপরিচয় ৮ থেকে ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, টিটন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। মূলত এলাকায় আধিপত্য ও হাট ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
টিটনের ভাই রিপন অভিযোগ করেন, বছিলায় একটি গরুর হাটের ইজারা নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন টিটন। কিন্তু এতে বাধা হয়ে আসে জামিনে বেরিয়ে আসা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইনামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। তার সঙ্গে যোগ দেয় কিলার বাদল ওরফে কাইল্লা বাদল, শাজাহান, ভাঙাড়ি রনিসহ অন্যরা।
রিপন বলেন, ‘গত ২৭ এপ্রিল গরুর হাট ইজারা নিয়ে ঝামেলার মধ্যে আমাকে একদিন টিটন ফোন করে জানায়, হাট নিয়ে ঝামেলা মিটমাট করতে উভয়পক্ষকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু সমঝোতা হয়েছে কি না জানি না। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে আমার ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।’
বুধবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পরিবারের কাছে টিটনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের তৈরি করা সুরতহালে দেখা গেছে, ডান কানের ওপরের ভাগে, বাঁ ভ্রুর ওপরে কপালে, পিঠের বাঁ পাশের নিচে ও পিঠের ডান পাশের ওপরে, বাঁ হাতের কনুইয়ের ওপরের সামনের দিকে এবং বাঁ হাতের কনুইয়ের নিচে, বাঁ বগলের নিচে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এগুলো গুলির ক্ষত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে হেঁটে নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন টিটন। আগে থেকে মোটরসাইকেলে অপেক্ষায় থাকা দুজন তার সামনে আসে। একজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে টিটনকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি করে। গুলির আঘাতে টিটন লুটিয়ে পড়লে কপাল বরাবর আরও একটি গুলি করে অস্ত্রধারী।
ঘটনাস্থলের কাছে উপস্থিত থাকা শিক্ষার্থী মেজবাহ রহমান বলেন, ‘মোটরসাইকেলে আসা দুজনেরই মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ ছিল। অন্তত ৫ রাউন্ড গুলি করার পর আশপাশের লোকজন হামলাকারীদের ধাওয়া দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন আরও দুই রাউন্ড এলোপাতাড়ি গুলি করে।’
খবর পেয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে।
পুলিশের নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘ঘটনাস্থলের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে পালিয়ে যাওয়ার পথে অন্য জায়গার ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেটা দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ফুটেজ দেখে মোটরসাইকেলের মডেল ও নম্বর বের করতে আমাদের টিম কাজ করছে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে বিজিবি গেটের পাশ দিয়ে ইরাকি মাঠের দিক দিয়ে পালিয়েছে। তবে তাদের ট্রেস শনাক্তে যতদূর সম্ভব ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে আলোচনায় আসেন টিটন। খুন, চাঁদাবাজি, জমি-বাড়ি দখল ও অস্ত্র কারবারে তার নাম আসে। হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকাজুড়ে তার নেতৃত্বে শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি হয়।
আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের বোনকে বিয়ে করেছেন টিটন। তারা দুজনই একসময় হারিছ-জোসেফ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিল। পরে তারা পৃথক হয়।
একাধিক হত্যা মামলায় টিটনের নাম আসে। ব্যবসায়ী বাবর এলাহীকে হত্যার পর তার নাম নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা করে সরকার। এ তালিকায় দ্বিতীয় নামটি ছিল টিটনের।
২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি জামিনে বের হন। এরপর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, ‘গরুর হাটের ইজারা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার থেকে শুরু করে আর যা যা আছে, সব বিষয় সামনে রেখেই আমাদের তদন্ত চলছে। হত্যায় সরাসরি জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। আর যারা নেপথ্যের ক্রীড়নক, তাদেরকেও শনাক্তে আমরা কাজ করছি।’