

প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যার ফলে রাজ্যে সরকার গঠনের পথ পরিষ্কার হয়েছে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় ঘিরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত সোমবার ঘোষিত ফলে ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে এবং তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের এই পরাজয় বাংলাদেশে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ঢাকা বিষয়টিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে দেখছে এবং এতে বিচলিত নয় সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে বিভিন্ন ধরনের সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘাত বা নিপীড়নের মাত্রা বাড়তে পারে।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে কোন দল ক্ষমতায় থাকল তার চেয়ে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক এবং অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, অতীতে নির্দিষ্ট কোনো দলের সঙ্গে সখ্যের চেয়ে বর্তমানে তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। দলের নেতাদের মতে, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি বা তিস্তা ইস্যু সমাধানে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি মূলত ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়। তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মেরূকরণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বা সার্বভৌমত্বে প্রভাব ফেলবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারতে কোন দল ক্ষমতায় এলো তা দেখার বিষয় নয়। আমরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি। তাই যে-ই ক্ষমতায় আসুক, সম্পর্ক একই থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করেছেন। নির্বাচিতদের আমি অভিনন্দন জানাই।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে পুশ ইন হলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে ঢাকায় সফররত মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের আমলে হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবে ভারত। তিনি আরও জানান, জুন মাসে বন্ধু দেশ চীন বা ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীন সফরে আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ভারতের নির্বাচন এবং সরকার গঠন সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কী পরিবর্তন আসছে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। ভারতের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমাদের বাংলাদেশের ফরেন পলিসি অ্যাক্রস দ্য বোর্ড একই থাকবে। বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতিতে আমাদের ফরেন পলিসি। যে সরকারই আসুক না কেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন হবে না। আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েই সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এগোব।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন মূল কাজ হলো সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে পণ্য আদান-প্রদান স্বাভাবিক রাখা জরুরি। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও টুরিস্ট ভিসা কার্যক্রম যেন রাজনৈতিক কারণে বাধাগ্রস্ত না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর দুই দেশের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাই ভারতের কোনো নির্দিষ্ট রাজ্যের দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে বেরিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. শামছুল আলম বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় শঙ্কিত হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে। তাদের আচরণ অনিশ্চিত। তাই সরকারকে সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে আলাদা ডেস্ক রাখতে হবে। তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ বিষয়ে কূটনৈতিক পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে আলোচনা প্রয়োজন।’
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সাবু বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিজেপির বিজয় ভারতের আঞ্চলিক ইস্যু। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত, ব্যবসা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। সরকার পরিবর্তনে দুই দেশের সম্পর্কে বড় কোনো অস্বাভাবিকতা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে নতুন বাস্তবতায় কিছু নীতিগত অগ্রাধিকার বা প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য প্রবাহ বা অভিবাসন ইস্যুতে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে। তবু সামগ্রিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছি।’