

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনীতি। গত বুধবার রাতে বাড়ি ফেরার সময় উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে রাস্তার ওপর চন্দ্রনাথ রথের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। হামলায় তার গাড়ির চালক গুরুতর জখম হন। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, ‘পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় এ হত্যা করা হয়েছে।’ রাজনৈতিক ‘প্রতিহিংসার’ অভিযোগও তুলেছেন তিনি। চন্দ্রনাথ হত্যার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। এতে রাজ্য পুলিশের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিআইডির কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
এদিকে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় রাজ্যপাল আর এন রবি রাজ্য বিধানসভা ভেঙে দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ১৭তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন তিনি। ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের প্রশাসনিক ইতি ঘটল। সেইসঙ্গে টানটান নাটকীয়তা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল। আনন্দবাজার জানায়, রাজ্যপাল টিএন রবির দপ্তরের তরফে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৭ মে (বৃহস্পতিবার) থেকে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য, বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার অর্থ হলো সরকারও আর নেই। ইস্তফা না দিলেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার মন্ত্রিসভা এখন ‘প্রাক্তন’। তবে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ মমতাকে বরখাস্ত করেননি রাজ্যপাল। আবার তাকে নতুন সরকারের শপথ পর্যন্ত ‘তদারকি মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেননি।
আগামী ৪৮ ঘণ্টা অর্থাৎ নতুন সরকারের শপথ পর্যন্ত রাজ্যের সব প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকছে রাজ্যপালের হাতেই। বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে আগামীকাল ৯ মে। এদিন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নিতে চলেছে রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার। শনিবার মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উপস্থিত থাকবেন বলে বিজেপি সূত্রে জানা গেছে। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ৯ মে সকাল ১০টায় ব্রিগেডের বিশাল চত্বরে এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। তবে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে এখনো ব্যাপক জল্পনা চলছে।
বৃহস্পতিবার শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার পিএ না হলে ওকে টার্গেট করা হতো না। এর একটাই কারণ হতে পারে, শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছে। আমি পরিবারের পাশে রয়েছি। দ্রুত চার্জশিট পেশ করে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি হয় তার চেষ্টা করব।’
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশ হয় ৪ মে। বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে বিজেপি। বিজেপির এ অভাবনীয় জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তারই মাঝে তার অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পরিচিত চন্দ্রনাথ রথকে খুন করা হলো। এক সময়ের রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র চন্দ্রনাথ রথ ভারতীয় বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই যে হাসপাতালে চন্দ্রনাথ রথকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার বাইরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। চন্দ্রনাথ খুনের প্রতিবাদে গতকাল পশ্চিম মেদিনীপুরের ভাদুতলায় বিজেপি কর্মী ও সমর্থকরা জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিন স্থানীয় দাগি অপরাধীকে আটক করেছে পুলিশ। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ঘটনার পর হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘এ ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’ চন্দ্রনাথের মৃত্যুকে ‘ব্যক্তিগত ক্ষতি’ অভিহিত করে শুভেন্দু বলেন, ‘ঠান্ডা মাথায় রেকি করে তাকে খুন করা হলো। তদন্তকারীদের কাছে আমার প্রার্থনা, এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক লোককে খুঁজে বের করে আইনি পথে ফাঁসিতে ঝোলানো হোক।’
শুভেন্দু বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোনো রথী-মহারথী ছাড় পাবেন না। তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে। এরই মধ্যে বিজেপির পক্ষ থেকে কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এলাকার কিছু তৃণমূল নেতা।
ভোটের ফল প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এই খুনের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তবে শুভেন্দু দলীয় কর্মীদের আইন নিজের হাতে না তুলে নেওয়ার এবং শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করছে, তাই আমরা এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছি না।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি কর্মীদের ওপর হামলা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দলের জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সব মিলিয়ে, সহকারীর খুনের পর রাজ্যে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
বিজেপি নেতা রুদ্রনীল ঘোষ বুধবার রাতে হাসপাতালের সামনে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘যে নৃশংসতার পরিচয় তৃণমূল দিয়েছে, তা থেকে বলা যায় তারা স্বভাব পরিবর্তন করবে না। আইন আইনের পথে চলবে, কাউকে ক্ষমা করা হবে না।’
চন্দ্রনাথ রথ হত্যার ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘অন্য কিছু করতে না পেরে শুভেন্দু অধিকারীর সহকারীকে গুলি করা হলো।’
দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পক্ষে নিহতের মা
চন্দ্রনাথ রথের মা সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি চাই অপরাধীদের শাস্তি হোক। আমি একজন মা এবং আমি চাই না, তাদের ফাঁসি হোক। আমি চাই তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হোক।’ তিনি এ ঘটনার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করেন।
তৃণমূল কী বলছে
চন্দ্রনাথ হত্যাকাণ্ডের পরই তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিবৃতি প্রকাশ করে ওই ঘটনার নিন্দা জানানো হয়।
ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আদর্শ আচরণবিধি বলবৎ থাকা সত্ত্বেও, তিন দিন ধরে বিজেপি সমর্থিত দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা সংঘটিত নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় আরও তিনজন তৃণমূল কর্মীর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি আমরা। এ বিষয়ে সম্ভাব্য কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি, যার মধ্যে আদালত-পর্যবেক্ষিত সিবিআই তদন্তও অন্তর্ভুক্ত, যাতে দোষীদের অবিলম্বে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা যায়। গণতন্ত্রে সহিংসতা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোনো স্থান নেই এবং দোষীরা যাতে জবাবদিহি করতে পারে, দ্রুত তার ব্যবস্থা করতে হবে।’
‘পেশাদার খুনিদের ছক, নিখুঁত নিশানা’
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, চন্দ্রনাথ হত্যাকাণ্ডে অত্যন্ত উচ্চমানের পেশাদারিত্বের ছাপ রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চন্দ্রনাথ যখন সাদা রঙের স্করপিও গাড়িতে করে ফিরছিলেন, তখন দুদিক থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, গুলি তার পেটের ডানদিকে এবং বুকের বাঁদিকে লাগে, যা সরাসরি হৃৎপিণ্ডকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। আততায়ীদের লক্ষ্য এতটাই নিখুঁত ছিল যে, গাড়ির বডি বা সামনের কাচে একটিও গুলি লাগেনি। শুধু জানালার কাচ ভেদ করে চন্দ্রনাথের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকেই লক্ষ্য করা হয়েছিল। চালকের পাশে বসে থাকা চন্দ্রনাথই যে একমাত্র টার্গেট ছিলেন, তা নিয়ে পুলিশের মনে কোনো সন্দেহ নেই।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত করতে আজ রাজ্যে অমিত শাহ
আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পরে আজ শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গে আসছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পরিষদীয় দলনেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেওয়া এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিতির জন্যই শাহের এ সফর। আজ পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়েছে। অমিত শাহের নেতৃত্বে ওই বৈঠকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বেছে নেওয়া হবে। পরদিন শনিবার ব্রিগেডে শপথ নেবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পরে দিল্লি ফিরে যাবেন অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের তরফে এমনটাই জানানো হয়েছে।
বিজেপি সূত্র জানায়, হবু বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে অমিত শাহের। বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেওয়ার কাজে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে তাকে। এই কাজের জন্য সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পড়শি রাজ্য ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে। যে কোনো রাজ্যে নির্বাচনের পরে পরিষদীয় দলনেতা বাছার সময় সেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের পাঠান বিজেপি নেতৃত্ব। তারা দলের নবনির্বাচিত প্রার্থী বা হবু বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই পরিষদীয় দলনেতার নাম ঘোষণা হয়ে যায়। এবার বিধানসভার অন্দরে বিজেপির ভূমিকা বদলাতে চলেছে। বিরোধী ভূমিকার বদলে বিজেপি এখন বিধানসভায় সরকারপক্ষের ভূমিকায় থাকবে। সে ক্ষেত্রে নতুন মুখ্যমন্ত্রীই হবেন বিধানসভায় শাসক দলের পরিষদীয় দলনেতা। অর্থাৎ, এবারের বৈঠকে শুধু পরিষদীয় দলনেতা নন, একই সঙ্গে স্থির হয়ে যাবে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নামও।