

গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ‘মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রেখেছে বর্তমান সরকারও। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট প্রস্তাবে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কিছু বিধান যোগ করার প্রস্তাব করেছেন। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে বলেও মনে করছে সরকার।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট প্রস্তাবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য ১৪ ধরনের পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে প্রথমটিই হলো বাণিজ্য প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণের মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা।
বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন দেশের শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, এই উদ্যোগ খুবই প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয়। যেসব দেশ বাণিজ্যকে গুরুত্ব দেয়, তাদের প্রায় সবারই এ ধরনের অঞ্চল রয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দ্রুত এবং আমদানি করতে হবে এমন কাঁচামাল হাতের কাছে পাওয়া যায়। এ ছাড়া ছোট ছোট কারখানার মালিক, যাদের বড় লটের কাঁচামাল আমদানির সক্ষমতা নেই, তারা এখান থেকে প্রয়োজনমতো কাঁচামাল কিনতে পারে। এতে আমদানি খরচ অনেক কমে যায়। কারণ অনেক কাঁচামাল রয়েছে যেগুলো অল্প পরিমাণ আনলে যা খরচ, বেশি পরিমাণে আনলেও প্রায় একই খরচ। এ ছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে সুবিধা হলে আশপাশের দেশগুলোর ক্রেতারা দূর থেকে পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি না করে আমাদের দেশ থেকে নেবে। এতে তাদের খরচ কম হবে এবং আমাদেরও মুনাফা হবে। সরকারও এই অঞ্চল থেকে বড় ধরনের রাজস্ব আয় করতে পারবে।
দেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান কালবেলাকে বলেন, এই উদ্যোগটি আরও আগেই নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। প্রতিটি দেশেই এমন অঞ্চল রয়েছে। আমি নিজে দুবাইয়ের একটি জোনে ওয়্যারহাউস ভাড়া নিয়ে পণ্য রপ্তানি করি। সেখানে নিয়ে পণ্য রাখি, সেখান থেকে আশপাশের দেশের বায়াররা পণ্য নিয়ে যান। কারণ তারা বড় লট নিতে পারেন না, ছোট ছোট লটে পণ্য নেন। আর আমার ছোট লট দিয়ে পোষায় না।
তিনি বলেন, এই অঞ্চল স্থাপন হলে সরকার এখান থেকে ভাড়া পাবে, তার অবকাঠামো ব্যবহারে ফি পাবে। কিছু লোকের কাজের ব্যবস্থা হবে। তার চেয়ে বড় সুবিধা হলো আমদানি-রপ্তানি ব্যাপক বাড়বে।
ফ্রি ট্রেড জোন বা মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল কী: মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোন হলো কোনো একটি দেশের এমন একটি নির্ধারিত এলাকা বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল যেখানে সাধারণত কাস্টমস বা শুল্ক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও শুল্ক প্রদান ছাড়াই পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনঃরপ্তানি করা যায়। এখানে কাঁচামাল বা প্রস্তুতকৃত পণ্য এই অঞ্চলে প্রবেশের সময় বা বের হওয়ার সময় কোনো আমদানি বা রপ্তানি শুল্ক দিতে হয় না। কাস্টমসের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলগুলোকে মূল দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে বিবেচনা করা হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কম থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি পায় এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের জন্য এটি একটি হাব হিসেবে কাজ করে। তবে এই অঞ্চল থেকে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করতে হলে নির্ধারিত আমদানি শুল্ক দিয়ে নিতে হয়। এই অঞ্চলে যে কোনো রপ্তানিকারক বা আমদানিকারক স্থান ভাড়া নিয়ে ওয়্যারহাউস তৈরি করতে পারেন, যেখানে তিনি তার পণ্য এনে রাখা ও নিজে ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে পারেন।
সাধারণত প্রধান সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা জাতীয় সীমান্ত এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলগুলো গড়ে ওঠে। যেমন দুবাইয়ের জেবেল আলী, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং পানামার কোলোনে এই অঞ্চল রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রণোদনা এবং অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। এফটিজেডের মধ্যে পরিচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতার সক্ষম হয়, যার ফলে দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া এর ফলে পণ্য সরবরাহ চেইন সমৃদ্ধ হয়।
বাজেটে যা আছে: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য খাতভিত্তিক বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কিছু বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করছি। মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ককর ব্যতিরেকে আমদানি করে তা সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের অভ্যন্তর হতে শুল্ক-কর পরিশোধ করে দেশের অভ্যন্তরেও সরবরাহের সুযোগ থাকবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এতে একদিকে যেমন এসএমই ও এমএসএমই খাতসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইন লিড টাইম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ওপর চাপ কমবে।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ফেলো সদস্য ও কর পরামর্শক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এবার বাজেটে অনেক ভালো উদ্যোগ রয়েছে, এর অন্যতম হলো মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত। এর যথাযথ বাস্তবায়ন যদি করা যায়, তবে দেশের বাণিজ্য প্রসারে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
২০২৫ এর উদ্যোগ: জানা যায়, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ৪০০ একর জমির ওপর একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (এফটিজেড) গড়ে তোলার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে ওই জমি পরিদর্শনে গিয়েছিল বিডাসহ সরকারের বড় একটি প্রতিনিধি দল। এর আগে ওই বছরের এপ্রিলে ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনে জাতীয় কমিটি গঠন করে সরকার। এক বছরের মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে জোন ঘোষণার কথা ছিল তাদের। জোন স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আইন, প্রণোদনা, মডেল ইত্যাদি পর্যালোচনার লক্ষ্যে ২১ এপ্রিল বেজার উদ্যোগে এই জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বেজা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিডার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই কমিটিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, কাস্টমস আইন, আমদানি ও রপ্তানি আইনসহ সংশ্লিষ্ট সব আইন, বিধিবিধান পর্যালোচনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।