কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৭:৫৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন না নেওয়ার চিন্তা সরকারের

তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন না নেওয়ার চিন্তা সরকারের

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আজ শুক্রবার পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদসহ একটি প্রতিনিধিদল তিস্তা ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শনে যাবে। এর আগে এ প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদীর উজানে বাঁধ দেওয়াসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি প্রবাহ কমে যায়। যার ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পসহ কৃষি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। জলাধার তৈরি করে সারা বছর পানিপ্রবাহ ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। অন্যদিকে প্রতি বছর তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে হাজার হাজার একর আবাদি জমি ও বসতবাড়ি বিলীন হয়। পরিকল্পিত ড্রেজিং ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এ ভাঙন রোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী খননের মাধ্যমে নৌ চলাচল সহজ ও পণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী করা সম্ভব। নদীকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক জোন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মৎস্য চাষের সুযোগ তৈরি হবে, যা পুরো অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প। তিস্তা নদী অববাহিকার স্থায়ী সমস্যা সমাধান এবং উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য এ মহাপরিকল্পনা অপরিহার্য।

নির্ভরযোগ্য সূত্র কালবেলাকে জানায়, একনেক সভায় প্রকল্প প্রস্তাব তোলার আগে আরও বিস্তারিত সমীক্ষা করা হবে। তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়নের আগ্রহ থাকলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে অর্থ লাগবে, তা বিদেশি ঋণে নয় বরং নিজস্ব অর্থায়নেই করতে আগ্রহী বর্তমান সরকার।

এদিকে, গত বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, তিস্তা নদীকেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ১১০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ (নদী শাসন), ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং ১৭০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নকাজ প্রস্তাব করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, তিস্তা এলাকার ৫টি জেলায় (রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাট) নদীভাঙন রোধে বিগত ও চলতি অর্থবছরে ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে, যা এ মাসেই শেষ করার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। এ কাজের মধ্যে রংপুর-৪ সংসদীয় এলাকার তিস্তা নদীর অংশে ভাঙন রোধে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান আছে, যার বাস্তবায়নও চলতি মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার নদীভাঙন অনেকাংশেই প্রশমিত হবে।

তথ্যমতে, কয়েক বছর আগে চীনা বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক সমীক্ষা পরিচালনা করে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয়ের একটি ধারণাপত্র বাংলাদেশকে দিয়েছিল। ওই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন গতি দেওয়া। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেবল অর্থনৈতিক বা কারিগরি বিবেচনাই নয়, বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক হিসাবও কাজ করছে। কারণ তিস্তা নদীর উজান ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৮৩ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতা হয়েছিল। সেখানে তিস্তার পানির ৩৯ শতাংশ ভারতের এবং ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশের জন্য নির্ধারণ করা হয়। অবশিষ্ট পানি নদীপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সে সমঝোতা কখনো স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নেয়নি।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। দুই দেশের মধ্যে একটি খসড়াও চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে শেষমুহূর্তে তা আটকে যায়। এর পর একাধিকবার বিষয়টি আলোচনায় এলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী পানিবণ্টন চুক্তি হয়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতেরও আগ্রহ রয়েছে। দিল্লি চাইছে না যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর শিলিগুড়ি করিডোরের নিকটবর্তী এলাকায় চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি হোক। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী এ করিডোরকে দেশটির নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্যদিকে চীন দক্ষিণ এশিয়ায় তার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বড় প্রকল্পে যুক্ত হতে আগ্রহী। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বন্দর, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে চীনের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিস্তা প্রকল্পকে বেইজিং বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। এসব কারণে তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্য বিদেশি ঋণ গ্রহণের বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থায়ন, ঋণের শর্ত এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে ঝুঁকছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারায়ণগঞ্জে সিএনজি-প্রাইভেটকার সংঘর্ষে প্রাণ গেল শিশুর, আহত ৫

ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ নরওয়ের

বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচে বইছে তিস্তার পানি

ফিফার পেজে বাংলায় ব্রাজিল বন্দনা

রাজশাহীতে ককটেল বিস্ফোরণে পুলিশ সদস্য আহত

শনিবার দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

আমার ‘আইডল’ নেইমার হলেও সর্বকালের সেরা মেসি: লামিন ইয়ামাল

হাইতির বিপক্ষে যে কৌশলী একাদশ নিয়ে মাঠে নামতে পারে ব্রাজিল

সকাল ৯টার মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব জেলায়

হাইতি ছাড়াও যে ম্যাচের সমীকরণ ব্রাজিলের মাথা ব্যাথার কারণ

১০

কাগজে ১২৭ শ্রমিক, মাঠে ৫০-এর নিচে : খাল খননে ‘অনিয়ম’

১১

পরীক্ষার্থীদের জন্য তুরস্কে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখানো বন্ধ

১২

যুক্তরাষ্ট্রে শত শত গোয়েন্দা কর্মীকে বহিষ্কারের পরিকল্পনা 

১৩

পুরোনো ভিডিও দিয়ে নোয়াখালীতে গুজব ছড়াচ্ছে আ.লীগ : পুলিশ

১৪

ব্রাজিলের বিপক্ষে হাইতি দৌড়াবে, স্বপ্ন দেখবে : কোচ মিনিয়ের বার্তা

১৫

৪৮ দলের বিশ্বকাপে সেরা ৩২: তৃতীয় হওয়া ৮ দল উঠবে যে নিয়মে

১৬

৬ মাসের মধ্যে চালু হচ্ছে ৫টি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

১৭

রাজশাহীতে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ

১৮

এবার ‘থালা-চামচ’ হাতে বিক্ষোভে নামতে যাচ্ছে ককরোচ পার্টি

১৯

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা

২০
X