এস আই শরীফ
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ১১:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশেষ লেখা

এখনো খুঁজে ফিরি সেই আঙুল

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বাবা নেই, চার বছর হতে চলল। সময়ের হিসাবে চার বছর হয়তো খুব বেশি নয়—কিন্তু বাবা হারানো মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই যেন দীর্ঘ শূন্যতা। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, ঋতু বদলায়, জীবনও সামনে এগোয়; কিন্তু বাবার অভাব কি কখনো পূরণ হয়, হয় না। অনেকেই বলেন, সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কিন্তু বাবা হারানোর ক্ষত কি কখনো সারে? মানুষ হয়তো বেঁচে থাকার তাগিদে মানিয়ে নিতে শেখে, কিন্তু বাবা নেই—সেই শূন্যতার সঙ্গে সত্যিকার অর্থে কেউই মানিয়ে নিতে পারে না।

আজও কোনো কারণে মন খারাপ হলে অজান্তেই মনে হয়, বাবাকে একটা ফোন দিই। তারপর বুকের ভেতর হাহাকার—যে নম্বরে ফোন করলে একসময় ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসত, সেটি আজ নীরব। যে মানুষটা সবসময় বলতেন, ‘চিন্তা করিস না, আমি আছি’, সেই মানুষটা আজ নেই। অথচ পৃথিবী চলছে তার নিয়মে, সবকিছু আছে আগের মতোই। শুধু জীবনের নির্ভরতার বড় অংশটা নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে।

ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ে। বাবার আঙুলটাই ছিল যেন দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। রাস্তা পার হতে গিয়ে, মেলায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে হাঁটতে যাওয়া—এসবই ছিল শৈশবের বড় আনন্দময় সময়। মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয় যখন বুকে কাঁপন ধরাত, তখন শক্ত করে ধরা বাবার সে আঙুলটাই যেন সাহস হয়ে থাকত। কতবার যে বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবীকে দেখতে শিখেছি, কত আবদার করেছি! কখনো খেলনা, কখনো নতুন জামা, কখনো কারণ ছাড়াই শুধু বাবার পাশে বসে তার শরীরের উত্তাপ নেওয়া।

বাবা হয়তো সব ইচ্ছে পূরণ করতে পারেননি, কিন্তু কখনো বুঝতেও দেননি তার সীমাবদ্ধতার কথা। নিজের অপূর্ণতাকে আড়াল করে সন্তানের মুখের হাসিতেই খুঁজে নিতেন নিজের পূর্ণতা। সময় মানুষকে বড় করে তোলে। একসময় নির্ভরতার সেই আঙুল ছেড়ে আমরা নিজেরাই চলতে শিখি। ব্যস্ততা বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে, বাড়তে থাকে দূরত্বও। অথচ বাবারা কখনো অভিযোগ করেন না। নিঃশব্দে সন্তানের জন্য চিন্তা করেন, প্রার্থনা করেন; নিজের ইচ্ছেগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন বড় করে তোলেন।

বাবারা বড় অদ্ভুতও। তারা ভালোবাসেন সবচেয়ে বেশি, অথচ প্রকাশ করেন কম। মায়েদের ভালোবাসা অনেকটাই স্পষ্ট, আর বাবারা দেখান দায়িত্বে, ত্যাগে আর পরিশ্রমে। অনেক সময় রাগ, শাসন কিংবা নীরবতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে তাদের গভীর মমতা। আমরা বড় হতে হতে অনেক দূরে চলে যাই। আমাদের অনেক কাজ আর অনেক বন্ধুর ভিড়ে বাবার সঙ্গে গল্প করার সময় হারিয়ে যায়। মনের ভেতর জমতে থাকা অনেক কথাও তখন বলতে চেয়েও বলা হয় না। মনে হয়, সময় তো আছেই—আরেকদিন না হয় বলব। কিন্তু নির্মম সত্য হলো—জীবন সব কথা বলার সুযোগ সব সময় দেয় না। কতবার ভেবেছি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলব—‘তোমাকে ভালোবাসি।’ কিন্তু বলা হয়নি কখনো। কতবার তার চিন্তাক্লিষ্ট ক্লান্ত মুখটা দেখেও জিজ্ঞেস করা হয়নি, ‘কেমন আছো, বাবা?’ এসব কিছু করতে গিয়ে, বলতে গিয়ে—কতশত বার ব্যস্ততার কাছে হার মেনেছি, কতশত দায়িত্বে জড়িয়েছি নিজেকে, কিন্তু বাবার সঙ্গে গল্প করার, তাকে সময়টুকু দেওয়ার সময়টাই শুধু হয়নি।

এভাবে একদিন বাবা চলে গেলেন, আর ফিরলেন না। তার যাওয়ার পর বুঝতে শুরু করেছি, বাবা শুধু একজন মানুষ নন। তিনি একটি সাহসের নাম, নিরাপত্তা আর আশ্রয়ের নাম। যখন কোনো বিপদ আসে, তখন আজও মনে হয়—বাবা থাকলে হয়তো এতটা ভয় পেতাম না। যখন কোনো সাফল্য আসে, তখন মনে হয়—বাবা থাকলে হয়তো সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ি—তখন মনে হয়, আজ বাবা থাকলে...

আজকাল আমরা সবাই ব্যস্ত। একই ছাদের নিচে বসবাস, তবুও একে অপরের থেকে যেন অনেক দূরে। হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু সময় নেই, গল্প নেই, আড্ডা নেই, অনুভূতি ভাগাভাগি করার সুযোগটুকুও নেই। অথচ একটা সময় ছিল, সন্ধ্যা হলেই বাবার পাশে বসে গল্প শোনাই ছিল বড় আনন্দের। সেই দিনগুলো আজ স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি। যাদের বাবা আছেন, তারা হয়তো বুঝতে পারেন না, কত বড় আশীর্বাদের মধ্যে আছেন। কারণ বাবা থাকাটা এতটাই স্বাভাবিক যে, তার অনুপস্থিতির কথা আমরা ভাবতেই চাই না। কিন্তু যাদের বাবা নেই, তারা জানেন—বাবাকে হারানো মানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছাতাটিকে হারিয়ে ফেলা।

আজও কোনো বয়স্ক মানুষকে ধীরে ধীরে হেঁটে যেতে দেখলে বাবার কথা মনে পড়ে। কোনো পরিচিত হাসি দেখলে মনে হয়, বাবা বুঝি এমন করেই হাসতেন। কোথাও বাবাকে নিয়ে লেখা কোনো গল্প পড়লে কিংবা কোনো শিশুকে বাবার হাত ধরে হাঁটতে দেখলে বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। তখন খুব ইচ্ছে করে, টাইম মেশিনে চড়ে আরেকবার যদি সেই দিনগুলোয় ফিরে যাওয়া যেত, আরেকবার যদি বাবার পাশে বসা যেত! আরেকবার যদি তার হাতটা ধরে বলা যেত, ‘বাবা, তোমাকে ছাড়া পৃথিবীটা এত কঠিন কেন!’

সময়ের কী অদ্ভুত পরিক্রমা! একদিন আমিই ছিলাম বাবার আঙুল ধরে পথ চলা সেই ছোট্ট শিশুটি, অথচ আর আজ দুই পাশে দুজন আমার আঙুল শক্ত করে ধরে হাঁটছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে, পৃথিবীটাকে দেখছে। ওদের ছোট্ট হাতের উষ্ণ স্পর্শে বারবার ফিরে আসে বাবার স্মৃতি। রাস্তা পার হওয়ার সময় হাতের মধ্যে ওদের মুঠো শক্ত হয়ে এলে মনে পড়ে—একদিন ঠিক এভাবেই বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরতাম। ছেলে-মেয়ের চোখে আমি হয়তো একজন ‘সুপার হিরো’, তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, নির্ভরতার জায়গা। তখনই বুকের মধ্যে অদ্ভুত অনুভূতি দোলা দেয়—মনে হয়, আমিও যেন আমার বাবার হাত ধরেই পথ চলছি। বাবা চলে গেছেন, কিন্তু তার ভালোবাসা, তার শিক্ষা আর তার ছায়া আমার মধ্যেই রয়ে গেছে। সন্তানদের প্রতি যে মমতা, উদ্বেগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা অনুভূত হয়, তার ভেতর দিয়েই যেন প্রতিদিন নতুন করে ফিরে আসেন তিনি।

জীবনের এ পর্যায়ে এসে বুঝতে শিখেছি—বাবারা কখনো হারিয়ে যান না। তারা শুধু একদিন সন্তানের হাত ছেড়ে দেন, আর সেই সন্তানই একটা সময় আরেকটি ছোট্ট হাত ধরে পথ দেখাতে শুরু করে। এভাবেই বাবারা বেঁচে থাকেন—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, আঙুল থেকে আঙুলে। হয়তো দূরাকাশে বসে বাবারা তার সন্তানদের জন্য প্রার্থনা করেন। হয়তো এখনো কোনো অদৃশ্য ছায়া হয়ে আগলে রাখেন।

বাবা দিবস এলে অনেকেই তার বাবার সঙ্গে ছবি তোলেন, শুভেচ্ছা জানান। আর কিছু মানুষ নিঃশব্দে দিগন্ত বিস্তীর্ণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো না বলা কথা নিয়ে শুধু ফিসফিস করে উচ্চারণ করেন—‘বাবা, তুমি যেখানেই আছো, ভালো থেকো। তোমাকে আর ছুঁতে পারি না, তোমার কণ্ঠ শুনতে পাই না, কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে ছাড়া একটা দিনও কাটে না। বয়স যত বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি, তুমি এ জীবনের কত বড় আশীর্বাদ ছিলে।’

বাবারা চলে যান; কিন্তু তাদের শিক্ষা, তাদের আদর, তাদের শাসন, তাদের ত্যাগ, তাদের অপূর্ণ স্বপ্ন—সবই চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকে সন্তানের হৃদয়ে। বলতেই হয়, মানুষ আসলে বাবাকে হারায় না; হারায় শুধু তার ছোঁয়া, তার কণ্ঠস্বর, তার শক্ত করে ধরা সেই হাত। আজও পথ চলতে গিয়ে কখনো কখনো মনে হয়, আমি বুঝি সেই ছোট্ট শিশুটিই আছি। পার্থক্য একটাই—চারপাশে হাজারো মানুষের ভিড়ে শুধু শক্ত করে ধরে রাখার মতো সেই হাতটা, সেই আঙুলটা আর খুঁজে পাই না। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি ঝড়-ঝঞ্ঝায়, প্রতিটি সাফল্য আর ব্যর্থতার মুহূর্তে এখনো অজান্তেই খুঁজে ফিরি—সেই হাত, সেই আঙুল।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্বামী পরিত্যাক্তা নারীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা, বৃদ্ধ গ্রেপ্তার

মালয়েশিয়ায় বন্দি বাংলাদেশিদের ফেরানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

মিয়ানমারে আটক ২৭ বাংলাদেশিকে ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

তুরস্ক, হাইতি ও তিউনিসিয়া যে কারণে বিশ্বকাপ থেকে বাদ

বারান্দা থেকে পড়ে অভিনেত্রী ঝিলিকের মৃত্যু, স্বামীর জামিন নামঞ্জুর

আকাশ পথে ইয়াবা পাচারকালে নারী আটক

আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়ার কতবার দেখা হয়েছিল, গোল কয়টি ও জয় বেশি কার?

চমক দিয়ে দল ঘোষণা করল ভারত

একসঙ্গে ৫ প্রবাসীর মৃত্যুতে শোকে কাতর গ্রামবাসী

২৪ মিনিটেই স্পেনের ৩ গোল

১০

ছয় জেলায় বজ্রপাতে তিন মাদ্রাসাছাত্রসহ ১১ জনের মৃত্যু

১১

ইরানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক একটি ঐতিহাসিক ঘটনা: জেডি ভ্যান্স

১২

শিশুকে যৌন নিপীড়ন, মাদ্রাসার অফিস সহকারী আটক

১৩

কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলারের সম্পদ ফেরত পাচ্ছে ইরান   

১৪

কিশোরগঞ্জে বজ্রপাতে নৌকার মাঝির মৃত্যু

১৫

সাবেক এমপি সেলিমা আহমাদ মারা গেছেন

১৬

একাদশে ফিরেই ইয়ামালের গোল, ১০ মিনিটেই এগিয়ে গেল স্পেন

১৭

ইয়াবাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা শাওন কারাগারে

১৮

সুইজারল্যান্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের প্রথম দফা শেষ

১৯

একাদশ ঘোষণা স্পেনের, এল বড় পরিবর্তন

২০
X