মো. লিখন হোসেন
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

বাবা নেই তবু, প্রতিদিনই আছেন

ছবি: এআই
ছবি: এআই

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। চারপাশে বাবাকে নিয়ে ছবি, স্মৃতি, শুভেচ্ছা আর আবেগের ভিড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই কেউ বাবার হাত ধরে হাঁটার গল্প বলছেন, কেউ পুরোনো ছবি পোস্ট করছেন। কেউ আবার বাবাকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলে লিখছেন; ‘আমার শক্তি, আমার ভরসা।’ আর ঠিক তখনই কিছু মানুষ নীরবে স্ক্রিন বন্ধ করে দেন। কারণ তাদের বাবা আর নেই।

আমিও সেই মানুষদের একজন। গত ৩ জুন বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। খুব বেশি দিন হয়নি। এখনো ঘরের ভেতর বাবার উপস্থিতি টের পাই। মনে হয় এই বুঝি দরজায় কড়া নাড়বেন, পরিচিত কণ্ঠে ডাক দেবেন, কিংবা হঠাৎ কোনো ছোট্ট বিষয়ে বকাঝকা করবেন। অথচ বাস্তবতা বড় নির্মম, কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটাই বদলে যায়।

বাবা মারা যাওয়ার পর সবচেয়ে অদ্ভুত যে অনুভূতিটা কাজ করে তা হলো, পৃথিবীটা হঠাৎ করেই অনেক অনিরাপদ মনে হয়। মাথার ওপর বিশাল এক ছায়া যেন সরে গেছে। আগে যত ঝড়ই আসুক, কোথাও একটা নিশ্চিন্ত ভাব ছিল বাবা আছেন। সেই বাক্যটার শক্তি আসলে কত বড়, তা হয়তো বাবা হারানোর আগে বোঝা যায় না।

আমাদের সমাজে বাবারা সাধারণত খুব কম কথা বলেন। তারা আবেগ প্রকাশে অভ্যস্ত নন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসাটাও প্রকাশ করেন দায়িত্ব দিয়ে। হয়তো কখনও বলেননি ‘ভালোবাসি’, কিন্তু রাত জেগে অপেক্ষা করেছেন। নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে সন্তানের চাহিদা পূরণ করেছেন। নিজের কষ্ট চেপে রেখে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন। ছোটোবেলায় আমরা বাবাকে শুধু একজন অভিভাবক হিসেবে দেখি। বড় হওয়ার পর বুঝি, একজন বাবা আসলে পুরো পরিবারের নীরব যোদ্ধা।

আমার বাবাও তেমনই ছিলেন। হয়তো খুব সাধারণ একজন মানুষ, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে মনে হয়েছে একজন মানুষ অন্তত আছে, যার কাছে ফিরে যাওয়া যায়। আজ সেই জায়গাটা ফাঁকা।

বাবা চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, মানুষ শুধু একজন সদস্য হারায় না, হারায় একটা সময়, একটা নিরাপত্তা, একটা অভ্যাস, একটা পৃথিবী। এখনও কখনও ফোন হাতে নিয়ে মনে হয় বাবাকে কল দিই। কোনো ভালো খবর পেলে মনে হয় আগে বাবাকেই বলি। আবার কোনো বিপদে পড়লে হঠাৎ মনে পড়ে যাকে সবচেয়ে আগে পাশে পেতাম, তিনি তো আর নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে নিয়ে ছবি, স্মৃতি আর আবেগঘন কথার ভিড়ে হয়তো অনেকেই বাবাকে নতুন করে ভাবছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই বাবাকে বুঝতে পারি? সংসারের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটিকে আমরা কতটা দেখি?

বাংলা সমাজে বাবাদের এক অদ্ভুত চরিত্র দেখা যায়। তারা নিজের কষ্ট খুব কমই প্রকাশ করেন। সংসারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, ভবিষ্যতের চিন্তা, চিকিৎসা কিংবা সামাজিক দায়িত্ব; সবকিছু নিজের কাঁধে নিয়ে নীরবে চলতে থাকেন। অনেক সময় পরিবারের মানুষ বুঝতেও পারেন না, একজন বাবা কতটা চাপের মধ্যে দিন কাটান।

আমাদের আশপাশে এমন অসংখ্য বাবা আছেন, যারা নিজের ইচ্ছা-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন গড়ে তুলেছেন। হয়তো নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনেননি, কিন্তু সন্তানের বই কিনতে কার্পণ্য করেননি। হয়তো নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু সন্তানের কোচিং ফি ঠিকই দিয়েছেন। এই আত্মত্যাগের হিসাব কোনো দিন লেখা হয় না।

বাবাদের আবেগ নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের নীরব নিষেধাজ্ঞাও আছে। ছোটোবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়; পুরুষ মানুষ কাঁদে না। ফলে একজন বাবা নিজের ভয়, ব্যর্থতা কিংবা মানসিক ক্লান্তি কাউকে বলতে পারেন না। সংসারের সামনে তাকে সব সময় দৃঢ় থাকতে হয়। অথচ তিনিও মানুষ। তারও ক্লান্তি আছে, ভাঙন আছে, না বলা কষ্ট আছে।

প্রযুক্তির এই সময়ে আমরা অনেক বেশি সংযুক্ত, কিন্তু সম্পর্কগুলো যেন আগের চেয়ে বেশি একা। একসময় পরিবারে সন্ধ্যার আড্ডা ছিল, একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস ছিল। এখন সবাই ব্যস্ত নিজের স্ক্রিনে। ফলে বাবার নীরব উপস্থিতিটাও অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়।

বাবা দিবস তাই অনেকের জন্য উদযাপনের দিন হলেও, কারও কারও জন্য এটি ভীষণ ব্যক্তিগত এক শূন্যতার দিন। যারা বাবা হারিয়েছেন, তারা জানেন; এই দিনটিতে বুকের ভেতর কেমন এক নিঃশব্দ ব্যথা জমে থাকে। তবে বাবারা কি সত্যিই চলে যান? হয়তো না।

একজন বাবা বেঁচে থাকেন তার শেখানো সাহসে, ব্যবহারে, কথায়, অভ্যাসে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে কখনও নিজের ভেতর বাবার ছায়া দেখা যায়। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাবার উপদেশ কানে বাজে। জীবনের কঠিন মুহূর্তে হঠাৎ মনে হয়, ‘বাবা হলে কী করতেন?’ মানুষ তখনই বুঝতে পারে, একজন বাবা আসলে মৃত্যুর পরও সন্তানের ভেতর বেঁচে থাকেন।

আজ বিশ্ব বাবা দিবসে যাদের বাবা আছেন, তারা হয়তো একটু সময় দিতে পারেন। ব্যস্ততার ভেতর থেকেও বাবার পাশে বসতে পারেন। কারণ অনেক সময় আমরা ধরে নেই, বাবা তো আছেনই। অথচ জীবন কাউকে আগাম সতর্ক করে না। আর যাদের বাবা নেই, তারা হয়তো আজ স্মৃতির কাছে ফিরে যাবেন। পুরোনো কোনো ছবি দেখবেন, বাবার ব্যবহৃত কোনো জিনিসে হাত রাখবেন, কিংবা চুপচাপ বাবার কথা ভাববেন।

বাবাকে হারানোর পর একটা বিষয় খুব বুঝেছি, পৃথিবীতে কিছু শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না। সময় হয়তো মানুষকে বাঁচতে শেখায়, কিন্তু কিছু অভাব আজীবন থেকে যায়।

তবুও জীবন থেমে থাকে না। বাবার শেখানো সাহস নিয়েই সামনে এগোতে হয়। কারণ বাবারা সম্ভবত এটাই চান, তাদের সন্তানরা ভেঙে না পড়ে দাঁড়িয়ে থাকুক।

বিশ্ব বাবা দিবসে তাই পৃথিবীর সব বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা। আর যারা চলে গিয়েও সন্তানের হৃদয়ে বেঁচে আছেন, তাদের জন্য দোয়া। কিছু মানুষ কখনও সত্যি হারিয়ে যান না। বাবারা ঠিক তেমনই।

লেখক: সহ-সম্পাদক, কালবেলা।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডিসি সারওয়ার প্রত্যাহার: স্থানীয়রা বলছেন ‘বাড়াবাড়ির ফল’

বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ জনের

নারীদের লুটে নেওয়া ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার 

সরকারি চাকরিতে কোন গ্রেডে কত পদ ফাঁকা, জানালেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী

পুলিশ দেখে পালানোর চেষ্টা, ‘ছাদ থেকে পড়ে’ আ.লীগ নেতার মৃত্যু

১০ দিনে দ্রুত বাড়তে পারে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্য একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে : ভ্যান্স 

ব্রাজিল সমর্থককে এআই দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে ট্রল, যুবককে লিগ্যাল নোটিশ

আশাশুনিতে ‘গোপন বৈঠক’ থেকে গ্রেপ্তার ৬

চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলা

১০

২০২৬ বিশ্বকাপের শীর্ষে রোনালদো, মেসি কোথায়?

১১

দুই বছর পর আবারও ওটিটিতে অপূর্ব

১২

চট্টগ্রামে ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালন

১৩

যুবদল নেতার ছুরিকাঘাতে শিবির নেতা নিহত

১৪

গ্রুপ পর্বে পয়েন্ট সমান হলে কে যাবে নকআউটে, যা বলছে ফিফার নতুন নিয়ম

১৫

লেবাননে ইরানি প্রক্সিরা না থামলে আবারও হামলা হবে: ট্রাম্প

১৬

বহিষ্কৃত শিবির নেতা জিসান ২ দিনের রিমান্ডে

১৭

পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসএসসি বিরাশিয়ানের প্রাণবন্ত আয়োজন

১৮

যোগ দিবসে কলকাতায় মোদির যোগাসনচর্চা 

১৯

আর্জেন্টিনার জার্সিতে ‘১৮৯৩’ লেখা, জানেন কি এর রহস্য?

২০
X