

গোল করলেন, আবার সতীর্থকেও গোলের পথ দেখালেন। প্রথম ম্যাচের পর যাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই ফিরলেন নতুনরূপে—আরও ক্ষুধার্ত, আরও প্রাণবন্ত, আরও শক্তিশালী হয়ে। গোল করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি দলকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। যেন বয়সকে অস্বীকার করে আবারও জানিয়ে দিলেন—মঞ্চ যত বড়ই হোক, আলোটা এখনো তার দিকেই ঝুঁকে থাকে।
রোনালদোর জোড়া গোলে উজবেকিস্তানকে ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে পর্তুগাল। তবে এই জয় শুধু স্কোরলাইনের নয়, এটি ছিল রোনালদোর ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের গল্পও। মাঠের পারফরম্যান্সে ফিরতেই হতো তাকে। যেন অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। যখন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আর্লিং হলান্ড নিজেদের দীপ্তিতে ফুটবলবিশ্বকে আলোকিত করছেন, তখন রোনালদো কেন নিভে থাকা কোনো ছায়ার নাম হয়ে থাকবেন?
তবে প্রত্যাবর্তনটা যে এত দ্রুত হবে, তা হয়তো খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিলেন। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ছয় মিনিট, সেই মুহূর্তেই গোল করে নিজের উপস্থিতি জানান দেন রোনালদো। যেন বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দেন—এই মঞ্চে আমিও রাজা। মেক্সিকান লেখক হুয়ান ভিলোরো তার বই ‘গড ইজ রাউন্ড’-এ লিখেছিলেন, ‘সাফল্যের জন্য রোনালদোর তৃষ্ণা তাকে দিয়েই শুরু এবং তাকে দিয়েই শেষ।’ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে সেই অদম্য তৃষ্ণারই আরেকটি ঝলক দেখা গেল। ডানপ্রান্ত থেকে জোয়াও কানসেলোর নিখুঁত বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে এনে অসাধারণ দক্ষতায় জালে পাঠান তিনি।
পর্তুগালের জার্সিতে এটি ছিল তার ১৪৪তম গোল। একই সঙ্গে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন তিনি। ইতিহাসের পাতায় যেখানে রোনালদো একা, অর্জনের শিখরেও যেন তিনি আলাদা এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার প্রতিটি সাফল্য নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—সীমা ভাঙার নামই রোনালদো। তবে শুধু নিজে গোল করেই থেমে থাকেননি তিনি, ১৭তম মিনিটে ডি-বক্সের সামনে ফ্রি-কিক পায় পর্তুগাল। সবাই যখন ধরে নিয়েছিলেন শট নেবেন রোনালদোই, তখন ঘটল ভিন্ন কিছু। নিজে শট না নিয়ে তিনি সুযোগ করে দিলেন নুনো মেন্ডিসকে। আর মেন্ডিসও দুর্দান্ত এক শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। পর্তুগাল এগিয়ে যায় ২-০ ব্যবধানে। গোলের পর রোনালদো মাথার দিকে আঙুল তুলে যেন বুঝিয়ে দিলেন—ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, এটি মস্তিষ্কের খেলাও।
এরপর নিজের দ্বিতীয় গোল পেতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে। ৩৯তম মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের নিখুঁত পাস থেকে দারুণ এক ফিনিশিংয়ে জালের ঠিকানা খুঁজে নেন রোনালদো। সেটিই ছিল তার দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোল। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপ মঞ্চে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় দশে। একই সঙ্গে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেও উঠে যান ৪১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড। বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন—মহান খেলোয়াড়দের গল্প সহজে শেষ হয় না।
প্রথমার্ধেই তিন গোলে এগিয়ে থাকা পর্তুগাল দ্বিতীয়ার্ধেও ধরে রাখে নিজেদের আধিপত্য। প্রতিপক্ষের একটি আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান আরও বাড়ে। ম্যাচের শেষদিকে রাফায়েল লিও গোল করলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-০। রোনালদোর সামনে অবশ্য হ্যাটট্রিক পূরণের সুযোগ এসেছিল একাধিকবার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভাগ্য কিংবা প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ—কোনোটিই তার পক্ষে যায়নি। দুই গোল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে। তবে তাতেই তিনি হয়ে ওঠেন ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল নায়ক। দুটি দুর্দান্ত গোল, নেতৃত্বগুণ এবং দলীয় খেলায় অসাধারণ অবদান রেখে পর্তুগালের বড় জয়ের ভিত্তি গড়ে দেন তিনিই। মাঠে আবারও তিনি প্রমাণ রাখলেন—ফুটবলের মঞ্চে আলোটা এখনও তার দিকেও।