

দীর্ঘদিন সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার পর শরিক দলগুলোকে মাঠে ফেরাতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে জোটবদ্ধ হয়েই মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। প্রথম ধাপে নিজেদের দলীয় ব্যানারে ছোট ছোট কর্মসূচি পালন করবে জোটভুক্ত দলগুলো। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বৃহত্তর আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সমন্বিতভাবে অংশ নেবে। সেই অনুযায়ী শরিক দলগুলো যে যার মতো করে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামে যোগ দেবে জোটের শরিক দলগুলো। এর পাশাপাশি জোটের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কৌশল নিয়েও কারাগারের ভেতরে ও বাইরে থাকা নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। আলোচনায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা এবং জোটভুক্তদের ধীরে ধীরে মাঠে সক্রিয় হওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো হলো—জাতীয় পার্টি (এরশাদ), জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, গণআজাদী লীগ, বাসদ (রেজাউর রহমান), সাম্যবাদী দল, ন্যাপ (মোজাফফর), গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাসদ, শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল, তরীকত ফেডারেশন ও কমিউনিস্ট কেন্দ্র।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের অনেক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ১৪ দলের সাবেক মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের পর শরিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে আছে জাতীয় পার্টি। গণঅভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলটির অনেক নেতাকর্মী হামলা, মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। এমনকি বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
জোট সূত্র জানায়, নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে রেখে বিদেশে যারা পালিয়ে গেছেন, তাদের নির্যাতিত নেতাকর্মীরা গ্রহণ করছে না। এজন্য বিদেশে থেকে কোনো নির্দেশনা এলেও কেউ মাঠে নামছে না। সারা দেশে নেতাকর্মীরাও দুই ভাগে বিভক্ত। এ জন্য দেশের ভেতর থেকে ক্লিন ইমেজের মুখপাত্র দেওয়ার আলোচনা চলছে।
জোট নেতাদের বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কারণ উঠেছে এসেছে। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের জন্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাই দায়ী। বিভাগ, জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন সব জায়গায় দুটা গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তো দলের প্রায় আসনেই স্বতন্ত্রপ্রার্থী ছিল। কাউকে কাউকে এমপি, জেলা-উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান বানানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কথা না রাখায় দলে বিভক্তি শুরু হয়েছিল। দলকে দুই ভাগে বিভক্তির করার সুযোগ নিয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।
সূত্র বলেছে, কারাগারে থাকা কয়েকজন নেতা জোটের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে একাধিকবার মতবিনিময় করেছেন। সেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শরিক দলগুলোকে নিজ নিজ সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাবেক আইন সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শ ম রেজাউল করিম কালবেলাকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির মধ্যে ঐক্য গড়ার উদ্দেশ্য নিয়েই ১৪ দলীয় জোট করা হয়। সেই ঐক্য যে অনিবার্য ছিল, বর্তমান অবস্থায় স্বাধীনতা বিরোধীদের উত্থানে সেটা নতুন করে আবার প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার পক্ষে এখনো রয়েছে। ১৪ দলীয় জোটের কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধভাবেই সব কিছু করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দেবে।’
তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া নিয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। কেউ কেউ যোগাযোগ ও আলোচনা হওয়ার কথা স্বীকার করলেও অনেকেই বলেছেন, আপাতত তারা নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের এ ধরনের কোনো আলোচনা সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানিয়েছেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো দলের আলোচনা হয়নি। জোটের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
জাতীয় পার্টির একাংশের নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো প্রস্তাব আসেনি। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে প্রস্তাব আসতে হবে। কিন্তু তারা তো দল হিসেবে কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ছাত্রলীগ-যুবলীগ মিছিলের মাধ্যমে মাঝে মধ্যে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা হামলা-মামলায় জর্জরিত। রাজনীতি করতে পারছে না। গোটা জাতি আজ স্তম্ভিত। বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে গেছে।’
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ বকুল কালবেলাকে বলেন, ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের সরকারে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো ছিল। ৫ আগস্টের পর যে যার মতো করে আছে। তবে বাস্তবতার নিরিখে এখনো সম্মিলিতভাবে পূর্ণ জোটবদ্ধ হয়ে মাঠে নামার পারস্পরিক বোঝাপড়া হয়নি। আমাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ ছিল, অফিস ভাঙচুর করেছে। আমাদের নেতাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলা রাখা হয়েছে। রাশেদ খান মেনন আমাদের নেতা, তাকেও মিথ্যা মামলায় জেলা রাখা হয়েছে। তার মুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন করছি এবং করে যাব। ইউনূস সরকারের আমল ছিল নৈরাজ্যের। তবে আমরা রাজনৈতিক সরকারের কাছে আশা করছি, তারা রাজনীতি করার অধিকার দেবেন। ওয়ার্কার্স পার্টি রাজনীতির মাঠে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে, তবে সেটা নিজেদের ব্যানারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ব্যর্থতা, হামে শিশু মারা যাচ্ছে; কিন্তু কেন টিকা আনা হলো না এবং আমেরিকার সঙ্গে অসম চুক্তি বিরোধিতা করে মাঠের কর্মসূচি পালন করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউনূস সরকার যাওয়ার আগে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করে দেশকে বিপদে ফেলে দেশের সর্বনাশ করে গেছে। ১৯৭১ সালে লড়াই করে যে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছিলাম, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করে ইউনূস তা খর্ব করেছেন; মার্কিন উপরিবেশ তৈরি করে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে হওয়া অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে তীব্র প্রতিবাদ ও সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছি।’
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া কালবেলাকে বলেন, ‘এখনো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্পষ্ট। আগে রাজনৈতিক পরিবেশ সুষ্ঠ হওয়ার দরকার। আমাদের সঙ্গে যাদের জোট ছিল, জোটে যেসব দল ছিল, তাদের সঙ্গে কথা হয়। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গেও কথা হয়। সবাই মিলে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছি। কারণ বেশিরভাগ নেতা মিথ্যা মামলায় জেলে আছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ও উদ্ধার করতে মাঠে নামতে পারি। তবে মাঠে নামার আগে পরিবেশ সুষ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন।’
জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘১৪ দলীয় জোট তো এখন আর নাই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় না। আমি করিনি। আমরা আমাদের মতো করে আছি।’
জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘মাঠের রাজনীতিতে জাসদ তার ভূমিকায় আছে। এখন পর্যন্ত শরিকদের সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামে জোটবদ্ধভাবে নামার সিদ্ধান্ত হয়নি। ১৪ দলের কর্যক্রম কীভাবে আছে সেটা সবাই জানে। আমাদের নেতা মিথ্যা মামলায় জেলে আছে। তার মুক্তি দাবিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে জাসদ।’