শফিকুল ইসলাম স্বপ্ন
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দিতে বহু কৌশল বিএনপির

দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচন
স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দিতে বহু কৌশল বিএনপির

দলীয় প্রতীকবিহীন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়িয়ে ‘একক প্রার্থী’ নিশ্চিত করাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাইয়ে কৌশলী পথে হাঁটছে দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ধানের শীষ প্রতীক না থাকায় দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়েও অনেকে প্রার্থী হতে পারেন। এতে একই পদে দলের একাধিক প্রার্থী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই প্রার্থী বাছাইয়ে তিনটি মানদণ্ড ঠিক করা হয়েছে। এ ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোটের মাঠে দল সমর্থিত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে দলের সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদেই (ইউপি) বিএনপির চার-পাঁচজন প্রার্থী। এদের কেউ স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুগত, কেউবা ভিন্ন ভিন্ন বলয়ের। এতে তৃণমূলে কোন্দল-গ্রুপিংয়ের পাশাপাশি সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড উদ্বিগ্ন। অপরদিকে, বিএনপির মাঠের প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বেশিরভাগ জায়গায় একক প্রার্থী দিচ্ছে। ভোটের প্রস্তুতিও আগে-ভাগে শুরু করেছে তারা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘ক্লিন ইমেজ’ সম্পন্ন স্থানীয় প্রভাবশালীরাও প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকতে পারে। সব মিলিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বিএনপির সামনে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হলো—বিতর্কমুক্ত ভোট করা এবং একক প্রার্থী বাছাই করে জাতীয় নির্বাচনের মতো ফলাফল অক্ষুণ্ন রাখা। এলাকায় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা—তিনটি মানদণ্ড প্রার্থী বাছাই করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে প্রার্থীদের ভোটারদের আস্থা অর্জন করে জয়ী হতে হবে। ফ্যাসিস্ট আমলের মতো প্রশাসনের সহায়তায় কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বর্তমানে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে আছেন। কালবেলাকে তিনি বলেন, বড় দলের প্রার্থী বেশি থাকবে—এটা স্বাভাবিক বিষয়। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ-অবদান এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয়তা বিবেচনায় প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কারো সুযোগ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য কালবেলাকে বলেন, দলের একাধিক প্রার্থী দাঁড়ালেও তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে প্রতিযোগিতায় নিতে চায় বিএনপি। কোথায় কোথায় গ্রুপিং-কোন্দল আছে তা চিহ্নিত করে দ্বন্দ্ব নিরসনে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকেদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তৃণমূলের নেতাকর্মী যারা নানা অপকর্মে জড়াচ্ছে, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের সমর্থন দেবে। সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসকদের দলের মেয়র প্রার্থী করার সম্ভাবনা বেশি। অতীতে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা দেখা করতে এলে তখন তিনি সর্মথন দিতেন। এবারও সেই রীতি অনুসরণ করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাকিরা স্থানীয়ভাবে দলের সমর্থন পাবেন। নেতাকর্মীদের দলের প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হবে। সংসদ নির্বাচনের মতোই এবার শরিক দলগুলোর প্রার্থীদেরও সর্মথন দেওয়া হতে পারে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু কালবেলাকে বলেন, দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে না। তাই নির্বাচনের জন্য অনেকে প্রস্তুতি নিতে পারে, তাদের আশা থাকতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন যখন আসে তখন বড় দলগুলোর প্রার্থীর অভাব হয় না। একাধিক প্রার্থী থাকলেও সমস্যা হবে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে। অনেকে নির্বাচন করার মাধ্যমে তার পরিচিত বাড়াতে চায়। কারও কারও দৃষ্টিতে কোন্দল, কারও কারও দৃষ্টিতে প্রতিযোগিতা। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

জামায়াতের একক প্রার্থীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের ভাবনা ছিল—এবার তারা ক্ষমতায় যাবে; কিন্তু জনগণের শেষ বিচারে দেখা গেছে, ক্ষমতায় নয় তারা আজন্ম ক্ষমতার বাইরে থাকার দল। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত একক প্রার্থী দিলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

জানা গেছে, চলতি বছরে অক্টোবর-নভেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে—এমনটা ধরে নিয়ে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী প্রার্থীরা। পাশাপাশি তাদের অনুসারীরা মাঠে সক্রিয় হয়েছেন। এতে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও কোন্দল বাড়ছে। এলাকায় মোটরসাইকেল শোডাউনের পাশাপাশি সাঁটিয়েছেন শুভেচ্ছা সংবলিত পোস্টার-ফেস্টুন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চালাচ্ছেন প্রচার, বিভিন্ন ইস্যুতে হচ্ছেন সোচ্চার। এমপিদের সর্মথন পেতে অনেকই এখন থেকেই শুরু করেছেন তদবির-লবিং। তৃণমূলে ক্রমেই ভেঙে পড়ছে দলের ‘চেইন অব কমান্ড’। তবে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই দলীয় হাইকমান্ড সমর্থন দেবে—এমনটিই প্রত্যাশা প্রার্থীদের।

প্রার্থীর ছড়াছড়ি: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশের ৩৩০টি পৌরসভার প্রতিটিতে ন্যূনতম তিনজন থেকে সাত-আটজন পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়ছে। পৌরসভার মতোই দেশের ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদের বেশিরভাগ জায়গায়ই একই চিত্র। এর পাশাপাশি দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদেও চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে বিএনপির প্রার্থী হতে আগ্রহীদের ছড়াছড়ি। সবাই বিএনপির ব্যানারে প্রচারণা চালাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে প্রার্থী হতে উচ্ছুক বিএনপির স্থানীয় নেতারা গ্রাম-গঞ্জে, পাড়া মহল্লা ও হাটবাজারে বেশি সরব রয়েছেন, যাদের অনেকে ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে তরুণদের নিয়ে শোডাউন করছেন, বড় পর্দায় সমর্থকদের খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করছেন। মূলত তরুণ ভোটারদের সমর্থন পেতেই এই আগাম পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা।

বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি এলাকায় দলের একাধিক প্রার্থী রয়েছে। দলের মনোনয়ন না পেলেও অনেকে ভোটের মাঠে থাকতে পারে। তখন নেতাকর্মীরা গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়বে। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসবে ততই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংর্ঘষের আশঙ্কা বাড়বে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

এমন পরিস্থিতিতে দলের নির্দেশনা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন ও যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক সাংগঠনিক সম্পাদক। দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) ও সিটির প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীন কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী দিলে শেষ পর্যন্ত সবাই এক হয়ে যাবে, মতপার্থক্য কমে আসবে। দল যাকে মনোনয়ন দেবে তাকেই সবাই মেনে নেবে। দলের নিয়ম, শৃঙ্খলা ও আইন যদি কেউ অমান্য করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে নেতাকর্মীরা অনেক কষ্ট ভোগ করেছে। দলের দুঃসময়ে কে ছিল, আন্দোলনে তার অবদান, আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার কে বেশি—এই বিষয়গুলো দেখে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে। শৃঙ্খলা মেনে প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হবে।

আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা) অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেন, বিএনপির মতো দলে প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা থাকবে এটা স্বাভাবিক। এবার দলীয় প্রতীক না থাকায় জনগণ যাকে ভোট দেবে সেই নির্বাচিত হবে। তবে দলের পক্ষ থেকে কাউকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুবার ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পেনাল্টিতে শট নিয়েছিলেন রোনালদো! সরগরম নেটদুনিয়া

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আশার প্রদীপ জ্বালায় যে ৪ আমল

ফেনীতে পূজা উদযাপন পরিষদের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

ভ্যান চুরি নিয়ে বিরোধের জেরে কুপিয়ে হত্যা

বিয়ের গুঞ্জনের মধ্যেই ২৬ মিলিয়ন ডলার অনুদান টেইলর-ট্র্যাভিসের

যেসব অঞ্চলে সন্ধ্যার মধ্যে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস

বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যুবককে হত্যা, ২ আসামি গ্রেপ্তার

আল কোরআন মাদ্রাসা মিরপুর ক্যাম্পাসে পুরস্কার বিতরণ ও অভিভাবক সমাবেশ

১৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন সামান্থা

বিরতি শেষে ফের শুরু হবে ভোটগ্রহণ, দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ১৮ শতাংশ

১০

‘সরকারি সম্পদ নিজের মনে করে সংরক্ষণ করতে হবে’

১১

আওয়ামী লীগ থেকে হানিফ খানের পদত্যাগ

১২

সাদাপাথরে নিখোঁজ চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার

১৩

রাস্তায় ফেলে যাওয়া বৃদ্ধের দায়িত্ব নিলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু

১৪

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে তল্লাশির মুখেও কেন হাসছিলেন মেসি

১৫

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ১৩টি বৈজ্ঞানিক তথ্য

১৬

পাকিস্তানে খাদে বাস পড়ে নিহত ৪০

১৭

যুদ্ধের শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের মহাকাব্য : লুকা মদরিচের অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের ইতি

১৮

উদ্ভাবনী কাজে কম সুদে ঋণের উদ্যোগ নেওয়া হবে: মির্জা ফখরুল

১৯

‘৫ জুলাই আমাদের বিয়ে, সবার আশীর্বাদ চাই’, বললেন আমির খান

২০
X