শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শেখ হারুন ও মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

চুক্তিভঙ্গের পর নতুন ফন্দি, হাঙ্গেরির ভেন্টিলেটর গছাতে চায় ঠিকাদার

সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় সম্প্রসারণ প্রকল্প
চুক্তিভঙ্গের পর নতুন ফন্দি, হাঙ্গেরির ভেন্টিলেটর গছাতে চায় ঠিকাদার

নির্ধারিত সময়ে আইসিইউ ও এনআইসিইউর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ২৮টি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করতে পারেনি ঠিকাদার। উল্টো জীবনরক্ষাকারী এসব সরঞ্জাম সরবরাহে দফায় দফায় সময় বাড়ানোর আবদার করেছে। তারপরও পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় দরপত্রের চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে হাঙ্গেরির ভেন্টিলেটর গছাতে চায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের শেষদিকে এসব ভেন্টিলেটর সরবরাহের শর্ত থাকলেও বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনে ভেন্টিলেটরগুলো পুড়ে গেছে বলে দাবি করে ঠিকাদার। তাই সরঞ্জাম সরবরাহে আরও চার মাস সময় চায়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি মেনে নিলেও ভেন্টিলেটর সরবরাহে ব্যর্থ হয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। এবার আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করেছে ঠিকাদার ‘আনিফকো হেলথকেয়ার’। ফলে জীবনরক্ষাকারী এসব সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তাই আনিফকোর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তবে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির প্রস্তাব করেনি স্টিয়ারিং কমিটি।

কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, ২৮টি ভেন্টিলেটর সরবরাহকারী আনিফকো হেলথকেয়ার দুই দফায় সময় চেয়ে প্রকল্প পরিচালকের কাছে আবেদন করে। সেখানে দাবি করা হয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনে ১৮টি আইসিইউ ভেন্টিলেটর, ৬টি পোর্টেবল ভেন্টিলেটর এবং চারটি নিউনেটাল ভেন্টিলেটর পুড়ে গেছে। তাই নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি এসব সরঞ্জাম। প্রথম দফায় সময় নিয়েও পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। পরে আবারও আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করে।

এদিকে, দরপত্রের চুক্তিতে সব পণ্যের উৎপাদক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হওয়ার শর্ত থাকলেও ২৮টি ভেন্টিলেটর হাঙ্গেরি থেকে সরবরাহ করতে চায় আনিফকো।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, শুরু থেকে আনিফকো হেলথকেয়ারের সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ‘যোগসাজশ’ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাই দরপত্রে অনেকটা বাড়তি সুযোগ পেয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। আর এজন্যই বারবার সময় বাড়াতে আবেদন করার সাহস পাচ্ছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি সরবরাহকারী আনিফকোর। গত ২৩ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সভাপতিত্বে আলোচ্য প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় নাকচ করা হয় আনিফকো হেলথকেয়ারের সময় বাড়ানোর আবেদন। সেই সঙ্গে দরপত্রের শর্তভঙ্গ করায় দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনঃদরপত্র আহ্বান করে একই গুণমানের সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত হয়। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আনিফকো হেলথকেয়ার সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ায় চুক্তি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে কেনাকাটা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয় স্টিয়ারিং কমিটি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুণমান ঠিক রেখে প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন করতে হাসপাতালের মহাপরিচালকে নিয়মিত তদারকির নির্দেশও দেওয়া হয়। সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে এ প্রকল্পের ব্যয় যেন বৃদ্ধি না পায় এ জন্য প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে জোর দেওয়া হয়।

আনিফকো হেলথকেয়ারের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল বাতেন শিকদার কালবেলাকে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশ থেকে ২৮টি ভেন্টিলেটর আমদানি করা হয়েছিল। ঢাকায় বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে রাখা অবস্থায় সেগুলো আগুনে পুড়ে যায়। এরপর সময় চেয়েছিলাম আবারও এলসি করে সরবরাহের জন্য। কিন্তু প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তাই প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা সময় বাড়াতে রাজি হয়নি। দরপত্রটি বাতিল করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এসব পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির প্রস্তাব করা হয়নি। যদিও আনিফকোর জালিয়াতি এখানেই শেষ নয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় সম্প্রসারণ প্রকল্পের’ প্রতিটি দরপত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের একাধিক প্রতিবেদনও কালবেলায় প্রকাশিত হয়েছে।

এ প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নিতে প্রায় প্রতিটি কাজেই অনিয়মের পথ অনুসরণ করেছে আনিফকো হেলথকেয়ার। জিডি-১২ (এসকেএইচইউপি) প্যাকেজের আওতায় ৩৯ ধরনের ৩৭৪টি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি কেনাকাটার দরপত্র আহ্বানের পর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাব জমা দেয়। ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর দরপত্রের বাক্স খোলা হয়। সেখানে আনিফকো হেলথকেয়ার নামের প্রতিষ্ঠানটিও অংশ নেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পের জিডি-১১, ১২, ১৩ ও ১৪ (এসকেএইচইউপি) প্যাকেজে বলা হয়েছে, শুধু যেসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে সেসব কাজের কমপ্লিশন সার্টিফিকেট বা কার্য সম্পাদন সনদ জমা দিতে হবে।

কিন্তু আনিফকো হেলথকেয়ার কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের কভিড (জিডি)-২১০২ প্যাকেজে ১৫টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ডের (এনওএ) কাগজ জমা দিয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ওই কাজের বিল উত্তোলন করতে পারেনি। আনিফকো ওই সময় দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে কার্য সম্পাদন সনদের পরিবর্তে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড বা চুক্তিপত্রের কাগজ জমা দেয়। স্বচ্ছভাবে যাচাইয়ে তাদের আবেদন বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আনিফকোকে কাজ পাইয়ে দিতে ওই এনওএ গ্রহণ করেন।

ওই সময় দরপত্রের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পের দরপত্র জিডি-১২ (এসকেএইচইউপি) প্যাকেজের আওতায় ১০টি অ্যানেসথেসিয়া মেশিন সঙ্গে ভেন্টিলেটর, ৫টি মটোরাইজ সি-আর্ম কম্প্যাটিবল ওটি টেবিল, একটি ল্যাপরোস্কপি সেট, একটি ফাউন্ডেশন এন্ডোসকপি সাইনাস সার্জারি (এফইএসএস) সেট, একটি সি-আর্ম ফর অর্থোপেডিক্স, একটি সি-আর্ম ফর ইউরোলজি সেট, একটি ডিফিব্রিলেটরসহ ৩৯ ধরনের ৩৭৪টি জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি কেনাকাটা করা হবে। জিডি-১১, ১২, ১৩ ও ১৪ (এসকেএইচইউপি) প্যাকেজের ১৫ দশমিক ১-এর শর্তে বলা হয়েছে, দরপত্র দাখিলের আগে শুধু সফলভাবে কাজ শেষ হয়েছে—এমন কাজের কমপ্লিশন সার্টিফিকেট বা কার্য সম্পাদন সনদ জমা দিতে হবে। চলমান কিংবা আংশিক শেষ হয়েছে এমন কোনো কাজের সনদ গ্রহণ করা হবে না।

৪৬৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় সম্প্রসারণ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ১২ মার্চ একনেক সভায় অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পটি ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের শুরু থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৩৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ এবং ৭২ শতাংশ।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. রফিকুল হক আনিফকো হেলথ কেয়ারের সঙ্গে দরপত্রের চুক্তি বাতিলের কথা স্বীকার করে বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আনিফকো নির্ধারিত সময়ে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে না পারায় স্টিয়ারিং কমিটি দরপত্রের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। দরপত্রের শর্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে শিগগির ১৮টি আইসিইউ ভেন্টিলেটর, ৬টি পোর্টেবল ভেন্টিলেটর এবং চারটি নিউনেটাল ভেন্টিলেটর কেনা হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রথমবার নকআউটে নেমেই বাজিমাত, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল মিসর

দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই, আমরা সবাই বাংলাদেশি: এমপি তাহসিনা রুশদীর

কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একাদশ ঘোষণা

অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে প্রথমবার শেষ ষোলোতে মিসর

আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগেই বিশ্বকাপ জয়ের ঘোষণা কেপ ভার্দের

চট্টগ্রামে অসহায় ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

বদলে গেল ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচের সময়!

মিসরের বিপক্ষে আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফিরল অস্ট্রেলিয়া

আলি খামেনির জানাজায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানায়নি ইরান 

পুরো কেপ ভার্দে স্কোয়াডের বাজারমূল্য শুধু আলভারেজেরই অর্ধেক

১০

যুক্তরাজ্যের আর্কাইভে মিলল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিরল কপি

১১

খামেনির জানাজার আগে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ

১২

আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে বড় সতর্কবার্তা

১৩

নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে এআই প্রযুক্তি: সিলেটে বাণিজ্যমন্ত্রী

১৪

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বহনকারী ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি অন্য কিছু

১৫

সিলেটে কালবেলার সাংবাদিককে শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টা, থানায় অভিযোগ

১৬

ছাত্রদল নেতা সামির আটকের পরদিন ‘বাড়ি দখলের চেষ্টা’, হামলা-লুটপাটের অভিযোগ

১৭

১৯৯০-এর ‘ক্যামেরুন ট্র্যাজেডি’ কি ফেরাবে কেপ ভার্দে?

১৮

খুলনায় র‍্যাবের অভিযানে অস্ত্র-গুলি উদ্ধার, জলদস্যু আজহারুল গ্রেপ্তার

১৯

তিস্তা সেচ ক্যানেলের পাশে মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

২০
X