

ডুবে যেতে যেতে জীবনের পথে ফিরে আসাটা অভ্যাসে পরিণত করেছে আর্জেন্টিনা। ৮৪ মিনিট পিছিয়ে থাকার পরও ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে পা রাখে লিওনেল মেসির দল। এ নিয়ে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠেছে এবং আগামী রোববার নিউজার্সিতে তারা স্পেনের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে আবারও হৃদয়ভাঙা পরাজয় নিয়ে ঘরে ফিরছে ইংল্যান্ড। তারা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে।
আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু তারা এমন বিপজ্জনকভাবে খেলছিল যে, তাদের এই লিড এক মুহূর্তের জন্যও নিরাপদ মনে হচ্ছিল না। এনজো ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত এক শটে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরে আসে। এরপর যেভাবে আক্রমণের ঢেউ তোলেন মেসিরা তাতে যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোলটি ছিল অবশ্যম্ভাবী।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত এক গোলে জীবনের পথে ফিরে আর্জেন্টিনা। ডান দিক থেকে লিওনেল মেসি ছোট একটি কর্নার নেন, বল ফেরত পেয়ে ২৫ গজ দূরে ফাঁকা জায়গায় থাকা ফার্নান্দেজকে নিখুঁতভাবে খুঁজে নেন। ফার্নান্দেজ এক মুহূর্তে বল নিয়ন্ত্রণ করে অসাধারণ দক্ষতায় এমন এক শট নেন, যা বাঁক খেতে খেতে দূরের কোণে গিয়ে জড়ায় জালে। শটটির কৌশল ছিল অনেকটা কিংবদন্তি জুনিনহো পারনামবুকানোর বিখ্যাত ফ্রি-কিকের মতো—পায়ের পাশ দিয়ে বলের ওপর খানিকটা নিচের দিকে আঘাত করে বলটিকে অনন্যভাবে দুলিয়ে দেওয়া। এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ গোল! সমতার সঙ্গে ছন্দও ফিরে পায় আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার দূরের পোস্ট ঘেঁষে নিচু শটে বল লাগানোর মুহূর্ত কয়েক পরই, মেসি ও’রিলিকে পরাস্ত করে অসাধারণ এক ডান পায়ের ক্রস বাড়ান, যা বিপজ্জনক গতিতে ছুটে যায় দূরের পোস্টের দিকে। পাঁচ গজ দূর থেকে স্টোনস ও জেমসের মাঝখান দিয়ে নিজেকে দারুণভাবে এগিয়ে নিয়ে লাউতারো মার্টিনেজ জোরালো হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। এক গোল পিছিয়ে পড়ার পর, বিশ্বকাপ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কার মুখে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে ওঠে—তা ছিল অসাধারণ, দুর্দান্ত এবং প্রশংসনীয়।
৫৫ মিনিটে গোলের দেখা পেয়েছিল ইংল্যান্ড। ডেকলান রাইস প্রথমে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে বল ক্লিয়ার করেন, এরপর ডান প্রান্তে থাকা রজার্সের কাছে একটি সহজ পাস বাড়িয়ে দেন। রজার্স সেখান থেকে দূরের পোস্টের উদ্দেশ্যে অসাধারণ বাঁকানো একটি ক্রস তোলেন। গর্ডন মোলিনাকে পেছনে ফেলে বলের বাউন্সটি নিখুঁতভাবে বিচার করেন এবং দারুণ দক্ষতায় বলটি মার্টিনেজের নাগালের বাইরে জালে পাঠিয়ে দেন। এটি সত্যিই অসাধারণ একটি গোল। একই সঙ্গে এটি টমাস টুখেলের কৌশলগত সাফল্যেরও প্রমাণ। ম্যাচের শুরুতে মর্গান রজার্সকে একাদশে রেখে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। আর এই গোল যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—ডান উইংয়ে ডান পায়ের খেলোয়াড় থাকাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ!
গোল হজমের পরপরই তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৫৭ মিনিটে স্পেন্সের দুর্দান্ত ট্যাকলে রক্ষা পায় ইংল্যান্ড! সিমিওনে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন। শট নিতে যাচ্ছিলেন—সম্ভবত গোলও হয়ে যেত। ঠিক সেই মুহূর্তে স্পেন্স অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্দান্ত এক ট্যাকলে বিপদ সামলে দেন। ট্যাকল করার পরই তিনি মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়ান এবং উচ্ছ্বাসে উদযাপন শুরু করেন। এমন অসাধারণ রক্ষণাত্মক মুহূর্ত উদযাপনেরই দাবি রাখে। আর্জেন্টিনা ভাল একটি সুযোগ তৈরি করেছিল প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে। মেসির দূরপাল্লার শটটি রক্ষণভাগের এক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে ফিরে আসে। সেই বলটি পেয়ে ফার্নান্দেজ একবার নিয়ন্ত্রণে এনে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে অসাধারণ এক বাঁকানো শট নেন, যা অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। পিকফোর্ড সর্বশক্তি দিয়ে গোলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়ে গিয়েছিলেন—শরীরের এমন সব পেশিতেও যেন টান পড়েছিল, যার অস্তিত্ব তিনি নিজেও জানতেন না। কিন্তু বলটি লক্ষ্যে থাকলে, সেটি ঠেকানোর সাধ্য তার ছিল না। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিট ছিল বাজে ফুটবলের প্রদর্শনী। দুই দলই মাঠে গড়াগড়ি খাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছিল। এরপর জুড বেলিংহ্যাম দারুণ একটি মুভ করেন। বাম দিক থেকে দুর্দান্ত বাঁকানো দৌড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ঢুকে পড়েন বেলিংহ্যাম। তবে ফার্নান্দেজ কোনো সুযোগই দেননি; গোল থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে তাকে ফাউল করে থামিয়ে দেন। রাইস ফ্রি-কিকটি নিখুঁতভাবে দূরের পোস্টের দিকে তুলে দেন। সেখানে জন স্টোনস লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে টপকে হেড করলেও বলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাইরে চলে যায়। চাপের মুখে এটি ছিল বেশ কঠিন একটি সুযোগ। এটাই ছিল ম্যাচে দুই দলের কারও প্রথম গোলমুখী প্রচেষ্টা। আসলে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা দেখে প্রথমার্ধের ফুটবলকে খেলাই মনে হয়নি। সুখের কথা চ্যাম্পিয়নের মতো খেলে সেমিফাইনালের মান রেখেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।