

রাতের আঁধারে ভারত থেকে বাংলাদেশে দফায় দফায় মানুষ ‘পুশইন’-এর চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী আদিতমারী, কালীগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) বিএসএফের একাধিক চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবে সব চেষ্টা প্রতিহত করা যায়নি।
কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, লালমনিরহাটের দুর্গাপুর সীমান্তে ‘পুশইন’ হওয়া ছয়জনকে সীমান্তের একটি দালাল চক্র ‘শূন্যরেখা’ থেকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করিয়েছে। পুশইনের শিকার এসব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা।
তারা জানিয়েছেন, বিএসএফের পুশইনের পর শূন্যরেখায় অপেক্ষা করতে হয়। পরে সীমান্তের একটি দালাল চক্রের সহায়তায় তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেন। তাদের কথায় উঠে এসেছে বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পুরো প্রক্রিয়া। দালাল ধরে দেশে ঢোকা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ৪ জুন রাতে তাদের সীমান্তের শূন্যরেখায় এনে জঙ্গলে ফেলে রেখে যায় বিএসএফ।
তারা জানান, সারা রাত রাস্তা খোঁজার পর ভোরে বিজিবি সদস্যদের সামনে পড়লে তাদের সীমান্তের কাছেই থাকতে বলা হয়। এরপর সীমান্তের একটি দালাল চক্রের সহায়তায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বলে দাবি তাদের। তারা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে কারো জন্মও ভারতে হয়েছে। কেউ কেউ শৈশবে বিভিন্নভাবে ভারতে যান। কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সীমান্ত থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে আদিতমারী উপজেলার নুর আমিন নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে পুশইনের শিকার ছয়জনকে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে বাংলাদেশে থাকা তাদের আত্মীয় ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ওই বাড়িতে অর্থ লেনদেন নিয়ে দরকষাকষি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথোপকথনের ভিডিও কালবেলার হাতে আছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নুর আমিনের বাড়িতে অর্থ লেনদেনের সময় সড়া নামে এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, কুঠিবাড়ি সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ওই ব্যক্তি পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের শূন্যরেখা থেকে নুর আমিনের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। কালবেলার হাতে থাকা ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি সড়া নামের ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘আপনিই তো তাদের নিয়ে আসছেন।’ এ সময় পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের একজন হাতজোড় করে সড়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে সড়া বলেন, ‘ভাই এদিকে ঝামেলা করা যাবে না।’
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, সড়ার সঙ্গে এক ব্যক্তি দরকষাকষি করছেন। একপর্যায়ে নুর আমিন ও সড়া এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করছেন। পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় পাশাপাশি এলাকায় বসবাস করতেন। তাদের একজন কিশোরী আঁখি খাতুন (১৪)। সে কালবেলাকে জানায়, তার জন্ম ভারতে। সে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করত না; বাড়ির কাজকর্ম করত।
আঁখি খাতুনের ভাষ্য, আট দিন আগে তাদের আটক করা হয়। এরপর টানা তিন দিন একটি বাসে করে তাদের নিয়ে আসা হয়। পরে বিএসএফ সীমান্ত পার করে জঙ্গলের মধ্যে ছেড়ে দেয়। পুশইনের শিকার আরাফাত সরদার (১৮) নামে একজন জানান, ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে তিনি ভারতে যান। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গুমাতে তিনি বসবাস করতেন এবং সেখানে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।
তিনি বলেন, বিএসএফ আমাদের সীমান্তের কাছে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছেড়ে দেয়। আমাদের সঙ্গে থাকা মোবাইল ও টাকা-পয়সা কেড়ে নেয়। শুধু জামা-কাপড়ের ব্যাগ ও হাতে ২০০ টাকা দেয়। তারা বলে বাংলাদেশে যা, ভুলেও এদিকে আসলে গুলি করে দেব। তিনি আরও জানান, সারা রাত পথ খুঁজে বেড়ানোর পর সকালে তারা বিজিবি সদস্যদের হাতে ধরা পড়েন। পরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। এরপর বিজিবি তাদেরকে ভারত সীমান্তের কাছে গিয়ে বসে থাকতে বলে এবং পরে ডেকে নেওয়ার কথা জানানো হয়। তখন তারা ছয়জন একসঙ্গে ছিলেন। কিন্তু পরে বিজিবি তাদের ডাকেনি বলে জানান।
আরাফাত বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে একজন সিনিয়র ব্যক্তি ছিল, যার জন্য আমরা এতদূর আসতে পারলাম। তিনিই দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে দালালের মাধ্যমে এই সাইডে (বাংলাদেশে) আসলাম।’ বিজিবি ও সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার সঙ্গে লালমনিরহাটের ২৮১ দশমিক ৬ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ কিলোমিটার জলসীমান্ত। এ সীমান্তে বিজিবির ১৫ লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন ও ৬১ তিস্তা ব্যাটালিয়ন দায়িত্ব পালন করছে। জেলাজুড়ে সীমান্ত পাহারায় রয়েছে ২৩টি বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি)।
লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলা—পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর সবকটিই সীমান্তবর্তী। জেলার আন্তর্জাতিক সীমান্তের সিংহভাগ ভারতের কোচবিহার জেলার সঙ্গে, আর উত্তর-পশ্চিমের একটি ছোট অংশ জলপাইগুড়ি জেলার সঙ্গে যুক্ত। পুশইনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের চওড়াটারী ও মাস্টারপাড়া সীমান্ত ঘুরে দেখা যায়, সীমান্তজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
সীমান্তবর্তী কাঁচা সড়ক ধরে সদস্যদের সাইকেলে টহল দিতে দেখা যায়। মাস্টারপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, সীমান্ত-সংলগ্ন বাঁশঝাড় ও ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে বিএসএফ এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় অংশে একটি সীমান্তচৌকিতে কয়েকজন বিএসএফ সদস্য অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া সীমান্তজুড়ে তাদের টহলও চোখে পড়ে। তবে একই সময়ে বাংলাদেশের অংশে একটি বিজিবি চৌকিতে কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই সীমান্ত দিয়ে কয়েক দফায় বাংলাদেশে লোকজনকে ‘পুশইন’ করার চেষ্টা করেছে বিএসএফ।
এমন পরিস্থিতিতে বিজিবির ডাকে এলাকাবাসীও সীমান্তে পাহারায় অংশ নেন।
তাদের অভিযোগ, বিজিবি সবসময় উপস্থিত না থাকায় কিছু মানুষ দালালদের সহায়তায় সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং নজরদারিও বেড়েছে। দুর্গাপুর এলাকার গন্ধমরুয়া গ্রামে যে বাড়িতে পুশইনদের নিয়ে আসা হয় সেই বাড়িটি নুর আমিন নামের এক ব্যক্তির। তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তবে পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের সীমান্ত পার হয়ে তার বাড়িয়ে ওঠার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
অবশ্য তার বাড়ির ভেতরে এ ঘটনার ছবি দেখানো হলে সেটি নিজের বাড়ির ভেতরের অংশ বলে তিনি স্বীকার করেন। এ সময় ছবিতে থাকা সড়া নামের ওই ব্যক্তিকে নিজের ভাগ্নে বলে পরিচয় দেন।
তিনি জানান, সড়ার আসল নাম মাজেদুল ইসলাম এবং বাড়ি সীমান্ত-সংলগ্ন কুঠিবাড়ি এলাকায়। পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের সীমান্ত থেকে এনে তার বাড়িতে রাখার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের কথা জানানো হলে নুর আমিন দাবি করেন, তার ভাগ্নে সড়া সেদিন তার পরিচিত বন্ধুদের নিয়ে তার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি তাদের কাউকে চিনতেন না।
আলাপের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমার ভাগ্নে সড়া তো মাঝেমধ্যেই লোকজন নিয়ে আসে। লোক আসে, চলে যায়। এখন ভাগ্নে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এলে তাকে তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না, কাকে নিয়ে এসেছে। এখানে এসে খাওয়া দাওয়া করে চলে যায়। আমি কিছু জিজ্ঞেস করি না।’ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সড়া এলাকায় এ নামেই পরিচিত।
তবে সীমান্ত-সংলগ্ন কুঠিবাড়ি এলাকায় তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার সঙ্গে কথা বলতে তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমবার কল ধরলেও প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর তিনি কল কেটে দেন। এরপর তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম কালবেলাকে বলেন, সীমান্তে ‘পুশইন’ ঠেকাতে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের গোয়েন্দা শাখা সীমান্তে ব্যাপক তৎপর।
তিনি বলেন, ‘৬-৭ জন একসঙ্গে ঢুকলে অন্তত আমাদের বাহিনীর লোকজনদের জানার কথা। তবে এমন হতে পারে, যেহেতু অনেক বড় সীমান্ত আর বিএসএফের সঙ্গে দালাল চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে দালাল চক্র ও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।