

আরচারিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কতটা কঠিন—এ সংক্রান্ত বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ওয়ার্ল্ড আরচারি, যেখানে ডেনমার্কের তারকা স্টিফেন হ্যানসেন বলেছিলেন, ‘নিজেকে শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন নয়, খুবই কঠিন।’ কঠিন কাজটা সহজে করছেন বাংলাদেশের তীরন্দাজরা—দ্রুত হারিয়েও যাচ্ছেন!
নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে তীরন্দাজরা শুধু পরিশ্রম করছেন—বিষয়টা এমন নয়। তাদের পেছনে থাকছে কোচিং স্টাফদের শ্রম-ঘাম, ফেডারেশনের বিনিয়োগ। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একজন নিজেকে শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার পর সম্প্রতি প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন রোমান সানা, দিয়া সিদ্দিকী, হাকিম আহমেদ রুবেল এবং অসীম কুমার। এ ধারা ঠেকাতে না পারলে বাংলাদেশ আরচারির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে—বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করতে ঢাকায় এসেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোচের দায়িত্ব পালন করা সাজ্জাদ হোসেন। সাবেক এ তীরন্দাজ কালবেলাকে বলছিলেন, ‘বিভিন্ন দেশে খেলার সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নেই; কিন্তু আগ্রহী উদীয়মান ক্রীড়াবিদ খুঁজে পাওয়াটা কষ্টকর। বাংলাদেশের চিত্রটা উল্টো—প্রতিভাবান উদীয়মান খেলোয়াড় আছে প্রচুর; কিন্তু এখানে আবার সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। শুধু আরচারি নয়, যে কোনো খেলায় বিশ্বমানে পৌঁছতে হলে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই।’
২০০৯ সালে এশিয়ান গ্রাঁ প্রি থেকে স্বর্ণ জিতেছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। ওটাই ছিল আরচারির বৈশ্বিক আসর থেকে বাংলাদেশের প্রথম বড় অর্জন। সাবেক এ তীরন্দাজ চার বছর ধরে আরব আমিরাতের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশি আরচারদের ভবিষ্যৎ মজবুত করার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘শুধু সরকার কিংবা ফেডারেশনের পক্ষে সবকিছু করা কঠিন—এটা বাস্তবতা। সরকারি ও ফেডারেশনের প্রচেষ্টার সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগও জরুরি। আশা করছি, বেসরকারি উদ্যোক্তারা দেশের আরচারি এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবেন।’
এশিয়ান গ্রাঁ প্রি থেকে সাজ্জাদ হোসেন যখন স্বর্ণ জয় করেন, তখন আরচারি ছিল দেশের অপ্রচলিত খেলা। খুব বেশি মানুষ এ খেলার খোঁজখবর রাখতেন না। স্বল্প সময়ে পাওয়া সাফল্যের পর দ্রুত বড় হয়েছে আরচারির পরিধি, সমৃদ্ধ হয়েছে খেলাটির অর্জনের খাতা। কিন্তু দেশের আরচারিতে ছিল অস্থিরতা। এখনো অব্যাহত আছে—বিস্ময়কর অস্থিরতা! যে কারণে সম্ভাবনাময় আরচারি বৈশ্বিক বড় আসরে ফুল হয়ে ফুটতে পারেনি। বৈশ্বিক আসর থেকে দেশকে প্রথমবারের মতো সাফল্য এনে দেওয়া সাজ্জাদ হোসেন খেলাটির প্রথম বড় তারকা। ২০০৯ সালের সাফল্যের পর হারিয়ে যেতেও সময় লাগেনি এই তীরন্দাজের। সাজ্জাদ হোসেনকে টপকে দ্রুতই পাদপ্রদীপের আলোয় হাজির হন ইমদাদুল হক মিলন। ২০১০ সালের যুব অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জন করেন ওই সময়কার তরুণ তীরন্দাজ। তার হাত ধরে অন্যান্য সাফল্যও পায় বাংলাদেশ। সাজ্জাদ হোসেনের মতো ইমদাদুল হক মিলনেরও হারিয়ে যেতে সময় লাগেনি।
এক এক করে দৃশ্যপটে হাজির হন শেখ সজীব, জিয়াউল হক, আবুল কাশেম মামুন, তামিমুল ইসলাম, অসীম কুমার, রোমান সানা, সাগর ইসলামরা। পুরুষ বিভাগের মতো নারীদের মধ্যেও একই অস্থিরতা লক্ষণীয়—মাথুই প্রু মারমা, বিউটি রায়, শ্যামলী রায়, বন্যা আক্তার, হীরা মনি, দিয়া সিদ্দিকীরা বড় রেসের ঘোড়া হতে পারেননি। উল্লিখিতদের অনেকেই এখনো খেলছেন। ক্যারিয়ারের বাঁকে নিজেদের পাদপ্রদীপের আলোয় তুলেও এনেছিলেন, আবার ছিটকেও গেছেন। সম্ভাবনাময় আরচারি থেকে বৈশ্বিক আসরে বড় অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও। গতকাল তীর এশিয়ান আরচারির সমাপনী অনুষ্ঠানে এসে আরচারির মাধ্যমে অলিম্পিক স্বর্ণপদকের স্বপ্নের কথা জানান তিনি। সেটা পূরণ করতে হলে যে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, তা আদৌ নিশ্চিত করা যাবে তো!