

সুইডেনের সোলনা শহরে জন্ম নেওয়া ইয়াসিন আয়ারির গল্পটা শুরু থেকেই জটিল আবেগের। বাবা আজ্জুজ আয়ারি তিউনিসিয়ান, মা আমিনা মরোক্কান বংশোদ্ভূত, জন্মসূত্রে তিনি সুইডিশ। সামনে খোলা ছিল তিনটি দরজা—সুইডেন, তিউনিসিয়া, কিংবা মরক্কো। আয়ারি বেছে নিলেন জন্মভূমিকেই—এই সিদ্ধান্তে বড় প্রভাবক ছিলেন তিউনিসিয়ান বাবা আজ্জুজ আয়ারি।
প্রত্যেক বাবা নিজের স্বপ্নের ভস্মীভূত ছাই থেকেই সন্তানের ভবিষ্যতের বীজ বপন করেন। ইউরোপ ফুটবলের উর্বর ক্ষেত্র, এই কারণেই হয়তো জন্মভূমি তিউনিসিয়া-সংক্রান্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখে ছেলের গায়ে সুইডেনের জার্সি জড়ানোর পথ খুলে দিলেন। সেই ছেলের গোল, তাও আজ্জুজ আয়ারির জন্মভূমি তিউনিসিয়ার বিপক্ষে, যা জন্ম দিল ভিন্নধর্মী এক গল্পের।
২০২১ সালে আফ্রিকান নেশনস সময় তিউনিসিয়ার ফুটবল ফেডারেশন আয়ারির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। সাংবাদিক বেন জ্যাকবসের বরাতে জানা যায়, তরুণ আয়ারি তখন তিউনিসিয়ার হয়ে খেলার ব্যাপারে আগ্রহীও ছিলেন। কিন্তু বাবা আজ্জুজ ছেলেকে রাজি করান সুইডেনকে বেছে নিতে। সুইডিশ সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ‘ছেলে যেন সুইডেনের হয়েই খেলে—কারণ এই দেশই আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, ছেলেকে বড় করেছে।’ এই সিদ্ধান্ত নিছক একটি জাতীয়তা বেছে নেওয়ার গল্প নয়—এ যেন কৃতজ্ঞতার এক নীরব শিক্ষা।
২০২২ বিশ্বকাপে জায়গাই হয়নি সুইডেনের। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবারের আসরে ফেরাটা তাই দেশটির জন্য ছিল বিশেষ উপলক্ষ। আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—গ্রুপ পর্বের প্রথম প্রতিপক্ষ হিসেবেই সুইডেনের সামনে পড়ল তিউনিসিয়া, যে দেশের সঙ্গে আয়ারির রক্তের বাঁধন। ১৫ জুন, মন্তেরেই স্টেডিয়াম। ম্যাচের সপ্তম মিনিটে তিউনিসিয়ার গোলরক্ষক আবদেলমুহিব শামাখের একটি ভুল বল ক্লিয়ারেন্স থেকে সুযোগ পান আয়ারি। দূরপাল্লার শটে বল জড়িয়ে দেন জালে—এমন এক গোল, যা আসরের সেরা গোলের তালিকায়ও জায়গা পেতে পারে। কিন্তু উদযাপনের বদলে তিনি বেছে নিলেন নীরবতা আর শ্রদ্ধা। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের হয়ে ইউরোপ মাতিয়ে লিভারপুলে আসা আলেকজান্ডার ইসাক আছেন, আক্রমণভাগের গুরুদায়িত্ব ভিক্টর গিউকেসের কাঁধে। তাদের ছাপিয়ে ইয়াসিন আয়ারির গোল—ভাগ্য বিধাতা হয়তো চাচ্ছিলেন বাবা দিবসের আগে রচিত হোক আবেগঘন এক গল্প! রাতের নায়ক তখনো তার গল্প শেষ করেননি। ম্যাচের যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে, বল দখলের লড়াই থেকে আরেকটি দূরপাল্লার শট—আবারও জালে বল, আবারও নীরবতা। এবারও কোনো উল্লাস নেই, শুধু একই রকম সংযত প্রতিক্রিয়া। ২২ বছর ২৫১ দিন বয়সী আয়ারি হয়ে উঠলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সুইডেনের হয়ে এক ম্যাচে জোড়া গোল করা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। পরিসংখ্যান যত চমকপ্রদই হোক না কেন, ম্যাচ শেষে মানুষের মনে গেঁথে থাকল অন্য একটি দৃশ্য—গোলের পর মাটিতে নতজানু এক তরুণের নীরব শ্রদ্ধা।
ফুটবল মাঠে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যেখানে জয়ের আনন্দ আর শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা একসঙ্গে বাস করে এক মানুষের হৃদয়ে। ইয়াসিন আয়ারির সেই নতজানু মুহূর্তটি ২০২৬ বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়তো গোলের পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের স্মৃতিতেই বেঁচে থাকবে সবচেয়ে বেশিদিন।
ফুটবল কিছু পরিবারের রক্তে মিশে থাকা ঐতিহ্য। এবারের বিশ্বকাপ সেই ঐতিহ্যেরই নতুন অধ্যায় রচনা করছে। আসরে ১০ ফুটবলার অংশ নিচ্ছেন যাদের বাবাও বিশ্বকাপে খেলেছেন। এবার এমন নজিরও দেখা যাবে—পিতা এক দেশের হয়ে খেলেছেন, পুত্র খেলতে যাচ্ছেন ভিন্ন দেশের হয়ে। ইতিহাসে ২৭ পিতা-পুত্র যুগল বিশ্বকাপের মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছেন, এবার সেই সংখ্যা আরও বাড়তে চলেছে।
১০ জন ফুটবলার ৮ ভিন্ন দেশের স্কোয়াডে আছেন। নরওয়ে ও আর্জেন্টিনা দুজন করে প্রতিনিধি—আর্লিং হালান্ড এবং ক্রিশ্চিয়ান থর্স্টভেড; আর্জেন্টিনার জার্সিতে আছেন জুলিয়ানো সিমিওনে ও নিকো পাজ। নেদারল্যান্ডসের পক্ষে জাস্টিন ক্লুইভার্ট, পর্তুগালের হয়ে ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও, আলজেরিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে লুকা জিদান, যুক্তরাষ্ট্রে সেবাস্তিয়ান বেরহাল্টার, দক্ষিণ কোরিয়ার লি তায়েসক এবং স্কটল্যান্ডের জার্সিতে অ্যাঙ্গাস গান।