সামিনা রোশনি
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৪ এএম
অনলাইন সংস্করণ

স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান: বাল্যবিয়ের বিষ-ছোবলে লাখো ছাত্রী

স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান: বাল্যবিয়ের বিষ-ছোবলে লাখো ছাত্রী

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তাসলিম লিরা (ছদ্মনাম)। প্রবাসী বাবা মেয়েকে বিয়ে দিলেন ঢাকার এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর সাথে। এইচএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে আগে বিয়ে হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন করেও বিয়ের হইহুল্লোড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আর যাওয়া হয়নি লিরার। কিন্তু ঢাকা বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া তারই ননদের মেয়ের পরীক্ষার তদারকির সব ভার তাঁর কাঁধে।

ভাগনী সকালে পড়তে উঠলে নিয়ম করে উঠতে হয় লিরাকে। কী খাবে, পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবার আগে কলম, এডমিড কার্ড সব ঠিকঠাক আছে কি না চেক করে দেওয়ার দায়িত্ব নববধূর। এই করতে গিয়েই যে নববধূর মনটা ভেঙে যায় তা দেখার কেউ নেই। বিবাহিত লিরার মন চলে যায় নিজের বান্ধবী সহপাঠীদের কাছে। তারওতো এই রকম করেই সবার সাথে সিরিয়াস মুডে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবার কথা ছিল। ছিল মাকে জড়িয়ে ধরে, বাবার আশীর্বাদ নিয়ে পরীক্ষার আসনে বসার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিরা বলেন, এটা ভাগ্য! বিয়ে করলে সবদিক থেকে নিশ্চিত মা-বাবা তাই তাদের কথা মানতে হলো।

আসলে কি তাই। লিরা, সানজিদা, দোলাদের মতো আরও কত লাখ লাখ নাম না জানা কিশোরী আজ বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বিয়ের পর লেখাপড়া চালানোর আশ্বাস থাকলেও আসলে কত জনের কপালে সেই সুযোগ হয়, বলতে গেলে জ্যোতিষশাস্ত্র জানতে হয় না। কিশোরীর গায়ে নববধূর ঘ্রাণ যাওয়ার আগেই নতুন মা হওয়ার আনন্দে বিভোর হয়ে যান তিনি। পড়ালেখার পাট তখন একেবারেই চুকে যায়। ঘর কন্যায় ব্যস্ততায় তখন দিন কাটে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেশজুড়ে শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা, অন্যদিকে পরীক্ষাকেন্দ্রের বেঞ্চগুলো জানান দিচ্ছে এক নীরব ও বেদনাদায়ক হারিয়ে যাওয়ার গল্প। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে সাড়ম্বরে নিবন্ধ করা প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীই ঝরে পড়েছেন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই অস্বাভাবিক অনুপস্থিতির নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে যে সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, তা একাধারে শিউরে ওঠার মতো চরম উদ্বেগের। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুপস্থিত বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে যে তাদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশের পরীক্ষার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বাল্যবিবাহই আজ উচ্চশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় সামাজিক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষা জীবনের সোনালী স্বপ্ন যখন ডানা মেলার কথা ঠিক তখনই এক বিপুলসংখ্যক কিশোরীকে বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। নোয়াখালী মহিলা কলেজের ছাত্রী ফাতিমা মাহি, পরীক্ষার বেঞ্চে বসার চেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছে। প্রস্তুতির ঘাটতি এবং ফেসবুক টিকটকে ভাইরাল হওয়াটাই তার কাছে বেশি মজার। তার মতে আয় করা এখন অনেক সহজ। বিনোদন যখন আয়ের মাধ্যম হয় তখন কেন কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হবে। যেখানে নিজের অফিস নিজের সময় মতো করব। কারো কোনো বকা নেই জবাবদিহিতা নেই, সার্টিফিকেট নিয়ে প্যারা নাই। ঠিক তার মতো ভাবনা পরীক্ষা না দেওয়া আরেক ছাত্রী নাবাহা বলেন, পড়তে ভালো লাগে না তাই আম্মুকে বলেছি এবার পরীক্ষা দেব না, মাও বললেন ঠিক আছে বিশ্রাম নাও।

গ্লোবাল ভিলেজ, প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের বেড়াজালে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা। সম্প্রতি দৈনিক সমকাল ও রেড অরেঞ্জ লিমিটেডে যৌথ উদ্যোগে ইয়ুখ শেয়ার-নেট প্রকল্প এবং অ্যাপ্লিফাই চেঞ্জের সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিলে বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বাল্যবিবাহকে জরুরি সামাজিক সংকট ঘোষণা দিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সরকার ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করার পরামর্শ দেন। আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (সিএমআরএ) সংশোধন করে ’বিশেষ বিধান’ ধারাটি অপসারণ কিংবা সংশোধনের দাবি জানান।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১ শতাংশের বেশি, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কিশোর-কিশোরী ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলেও তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

বাল্যবিয়ের পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য এবং পরীক্ষার পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবম বা দশম শ্রেণিতে বাল্যবিয়ের হার নিয়ে কিছুটা আলোচনা হরেও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে যে এত বিশালসংখ্যক ছাত্রী একই কারণে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে, তা আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেকে শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রনভতার উল্লেখযোগ্য কারণ।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার অবশ্য আরেকটি দিকের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার কারণে নির্ধারিত বছরেও পরীক্ষায় অংশ নেয় না; তারা পরবর্তী বছরগুলোতে পরীক্ষায় বসে।

তবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রস্তুতির অভাবের পেছনেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে পারিবারিক চাপ ও বিয়েসংক্রান্ত মানসিক অস্থিরতা। একবার পড়াশোনার গতি থেকে ছিটকে পড়লে একটি মেয়েল পক্ষে পুনরায় পড়াশোনায় ফেরা গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জাতীয় এই ক্ষতি ও লাখো কিশোরীর স্বপ্নভঙ্গের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, শিক্ষার এই দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন গণ-ঝরে পড়া রোধ করা যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করবে মন্ত্রণালয়।

বাল্যবিয়ে শুধু একটি মেয়ের ব্যক্তিগত অধিকারই ক্ষুণ্ন করে না বরং এটি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের চাকাকে স্তব্ধ করে দেয়। সাড়ে পাঁচ লাখ সম্ভাবনাময় তরুণের এই হারিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এখনই যদি স্থানীয় প্রশাসন, অভিভাবক ও সমাজ সম্মিলিতভাবে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক বিশাল মেধাবী ও স্বাবলম্বী নারী জনগোষ্ঠী থেকে বঞ্চিত হবে। পরীক্ষার টেবিলগুলো যেন আর শূন্য না থাকে কিশোরীদের খাতা-কলম যেন রান্নাঘরের ব্যস্ততায় হারিয়ে না যায়-এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

লেখক: সামিনা রোশনি

এসোসিয়েট ম্যানেজার, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাবার কাঁধে চড়ে এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে আফিয়া

টানা ৩০ মিনিটের বেশি বসে থাকলেই বাড়তে পারে ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের ৮ দিন পর একজনকে জীবিত উদ্ধার

শেষ ষোলোয় রোনালদোদের প্রতিপক্ষ কারা, ফিরছে নেশনস লিগের সেই ফাইনাল

নতুন দায়িত্বে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ডাক-টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও আইনমন্ত্রী

৩ জুলাই / আজকের নামাজের সময়সূচি

আলিম পরীক্ষা  / নিয়মিতদের হাতে অনিয়মিত প্রশ্ন, কেন্দ্র সচিবসহ ৫ জনকে অব্যাহতি

ইরানের সঙ্গে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান সাবেক মার্কিন আলোচকের

বিশ্বকাপের মাঝেই ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে ঝরল ফিলিস্তিনি গোলরক্ষকের প্রাণ

অফসাইডে ভাঙল ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্ন, নাটকীয় জয়ে শেষ ষোলোয় পর্তুগাল

১০

পর্তুগালকে সমতায় ফেরালেন রোনালদো

১১

অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়লেন রোনালদো

১২

ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২৭

১৩

ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া, বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার

১৪

ইতালিতে ট্রিপল মার্ডারের একমাত্র সাক্ষী আমিরের জবানবন্দি

১৫

শেষ ষোলোর টিকিট কেটে যে রেকর্ড গড়ল স্পেন

১৬

সাঁতার শিখতে গিয়ে প্রাণ গেল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের

১৭

অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন

১৮

শ্রমিক নেতাকে হত্যা, ছাত্রদলের ২ নেতা বহিষ্কার

১৯

নরওয়ে ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে বড় সুসংবাদ

২০
X