

ফুটবল মাঠের কিছু মুহূর্তে সময়ও যেন থমকে দাঁড়ায়। দিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসি, দুজনেই সেই থমকে যাওয়া মুহূর্তের স্রষ্টা। দুই কিংবদন্তি যেন এক রেখায় মিললেন আটলান্টায়—পিছিয়ে পড়েও ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিত করার পর মেসি আকাশে তর্জনী দেখিয়ে প্রয়াত ম্যারাডোনাকে জয়টা উৎসর্গ করলেন। একজন এসেছিলেন ঝড়ের মতো, স্বল্প সময়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে চলে গেছেন কিংবদন্তির মিছিলে। অন্যজন হেঁটেছেন দীর্ঘ, ধৈর্যশীল পথে, প্রতিটি মৌসুমে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। দুজনের খেলার ধরন আলাদা, কিন্তু গন্তব্য এক—ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখর। পরিসংখ্যানের নিরিখে তাদের তুলনা করলে বেরিয়ে আসে মনোমুগ্ধকর কাহিনি, যেখানে প্রতিভা আর সংখ্যা হাত ধরাধরি করে হাঁটে। মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নৈপুণ্যে আজও ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে বিস্ময়। সাত ম্যাচে ৫ গোল আর ৫ অ্যাসিস্ট—এক আসরে ১০ গোল-সম্পৃক্ততার কীর্তি। আসরে আর্জেন্টিনার ১৪ গোলের দশটিতেই তার অবদান, যা প্রায় একক হাতে দলকে চ্যাম্পিয়ন বানানোর গল্প লিখেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—বিতর্ক আর শিল্পের সহাবস্থান ফুটবল ইতিহাসে বিরল। ক্যারিয়ারে চার বিশ্বকাপে ২১ ম্যাচে আট গোল, আট অ্যাসিস্ট।
মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা ভিন্ন ধাঁচের—দীর্ঘ, ধৈর্যের পরীক্ষায় ভরা। ২০০৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ৬ বিশ্বকাপ খেলে দেশকে তিনটির ফাইনালে তুলেছেন। কাতারে হাতে উঠেছিল সোনার ট্রফি, যার জন্য অপেক্ষায় ছিল ৩৬ বছর। ৩৯ বছর বয়সেও বিস্ময় জাগানো মেসি রেকর্ডের মালা গেঁথে এখন চার বছর আগে জেতা মুকুট রক্ষার মঞ্চে। ম্যারাডোনার ক্লাব ক্যারিয়ার ছিল ঝলমলে কিন্তু ঝড়ো—আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা আর ন্যাপোলি মিলিয়ে প্রায় তিনশর বেশি গোল করেছিলেন। ন্যাপোলিতে তার সময়টাই ছিল ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ—দক্ষিণ ইতালির অবহেলিত ক্লাবকে দুবার সিরি’এ চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিলেন, জিতিয়েছিলেন উয়েফা কাপও। ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে মিডফিল্ডার হিসেবে ইতালিয়ান লিগে ২৮ গোল করার রেকর্ড আজও অক্ষত।
মেসির গল্পটা সংখ্যার অবিরাম উৎসব। বার্সেলোনায় একাই করেছেন ৬৭২ গোল—একটি ক্লাবের হয়ে যা বিশ্বরেকর্ড। লা লিগায় ৪৭৪ গোল নিয়ে তিনিই এই লিগের সর্বকালের সেরা গোলদাতা। ১০ লা লিগা শিরোপা, ৪ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—এই তালিকা যেন শেষ হতে চায় না। আটবারের বিশ্বসেরার স্বীকৃতিও যেন মেসিকে বর্ণনায় অপ্রতুল! কোপা আমেরিকায় ৭ আসরে ১৪ গোল আর দুটি শিরোপা জিতে রচনা করেছেন আর্জেন্টিনার সোনালি অধ্যায়। ২০১২ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোলের কীর্তি গার্ড মুলারের চার দশকের পুরোনো রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ম্যারাডোনা আর মেসির মধ্যে পার্থক্য শুধু গোল অ্যাসিস্টের হিসাবে নয়। ম্যারাডোনা ছিলেন সংক্ষিপ্ত সময়ের দাবানল—প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল স্বল্প পরিসরে, কিন্তু তীব্রতায়। মেসি বেছে নিয়েছেন দীর্ঘস্থায়ী উজ্জ্বলতার পথ, দুই দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন। একজন একটি বিশ্বকাপকে একক প্রতিভায় রাঙিয়ে দিয়েছিলেন, আরেকজন এক দীর্ঘ সাধনার শেষে সেই মঞ্চ জয় করেছেন সতীর্থদের নিয়ে দল গড়ে। মজার বিষয়, দুজনেই একটি বিরল কীর্তির অংশীদার—অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকাপ, দুই জায়গাতেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতায় সহাবস্থানে দুই কিংবদন্তি।
পরিসংখ্যান শেষ পর্যন্ত একটি আয়না মাত্র—তাতে প্রতিভার প্রতিফলন দেখা যায়, কিন্তু আবেগের উত্তাপ ধরা পড়ে না। ম্যারাডোনা যখন বল পায়ে নাচতেন, নেপলসের রাস্তায় মানুষ চোখের জল ফেলত ভালোবাসায়। মেসি যখন বল পায়ে দৌড়ান, স্টেডিয়াম জুড়ে নেমে আসে এক নিঃশব্দ বিস্ময়। সংখ্যা বলবে কে বেশি গোল করেছেন, কে বেশি ট্রফি জিতেছেন—কিন্তু কে বেশি বড়, সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়েই আলাদা আলাদা করে লেখা আছে।
দুই কিংবদন্তির তুলনা করা হলে মেসির হৃদয়ে কি লেখা—জানবেন না? শুনুন মেসির কণ্ঠেই, ‘দিয়েগো সত্যিই মহান ছিলেন। আমি কখনো নিজেকে তার সঙ্গে তুলনা করতে চাইনি; আমার কাছে তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ। আজ তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, তিনি খুশি হবেন এবং এই সবকিছু উপভোগ করবেন।’