

অ্যাডহক চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। রাজনৈতিক পরিচয় পুঁজি করে ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যান। বিদায়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক ও রাজনৈতিক প্রভাবে নিজের মতো করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে প্রভাব বলয় তৈরি করেন। ইনস্টিটিউটের তৎকালীন শীর্ষ ব্যক্তির আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, কেনাকাটা ও ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিন—সবকিছুই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। জবরদখল থেকে কেনাকাটায় অনিয়ম, সবকিছুর নেতৃত্বে ছিলেন এই চিকিৎসক। জুনিয়র চিকিৎসক হয়েও সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জন্সকে জিম্মি করে রাখেন। কে কোন পদে নির্বাচন করবেন, সেটাও তিনিই নির্ধারণ করে দিতেন। দুই বছর আগে সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জন্স অব বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়েও এক সিনিয়র চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন। এত সব অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তিনি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ডা. হোসেন ইমাম ইমু।
তার বিরুদ্ধে লিখিতভাবে এসব অভিযোগ করেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফুল ইসলাম। তিনি ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি প্রকল্পগুলোর তৎকালীন সমন্বয়কারীর কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। অভিযুক্তের কোনো শাস্তি তো হয়নি, উল্টো নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অভিযোগপত্রে ডা. মো. মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ঢাকার বাইরে কর্মরত দেশের সবচেয়ে সিনিয়র প্লাস্টিক সার্জন। ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জন্স অব বাংলাদেশের (এসপিএসবি) নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে যাই। দুপুরে ইনস্টিটিউটের তৃতীয় তলার ৩২৫ নম্বর কক্ষে নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নওয়াজেশ খানের হাতে ট্রেজারার ও আরেকটি পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিই। এ সময় ইলেকশন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান (বিভাগীয় প্রধান, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং) উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কাজ শেষ করে পাশের কক্ষে (৩২৪নং কক্ষ) দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসিব রহমানের কক্ষে প্রবেশ করি। ওই কক্ষে তখন ডা. হাসিব এবং আরেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বরিশাল থেকে দীর্ঘপথ যাত্রা শেষে ক্লান্ত ছিলাম। তাই ৩২৪ নম্বর কক্ষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। ১০ মিনিট পর ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ডা. হোসেন ইমাম ইমু তার সহযোগী রেজিস্ট্রার ডা. মনসুর রহমান চৌধুরী, আরএস ডা. আইয়ুব হোসেন এবং ডা. মোর্শেদ কামালসহ ওই কক্ষে উপস্থিত হন। ডা. হোসেন ইমাম ইমু অপারেশন থিয়েটারের পোশাক পরে ছিলেন। ওই কক্ষে প্রবেশ করেই আমাকে তিনি ধমকের সুরে বলেন, ইনস্টিটিউটে ঢুকতে আমি তার অনুমতি নিয়েছি কি না? কেন আমি ট্রেজারার পদে নমিনেশন জমা দিয়েছি? কে আমাকে এ পদে দাঁড়াতে ইন্ধন জুগিয়েছে? এক্ষুনি পেপার উইথড্রো করতে হবে। না হলে সেখান থেকে বের হতে পারব না। তার মারমুখী আচরণ ও উচ্চ স্বরের ধমক-চেঁচামেচিতে আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। ইতোমধ্যে কিছু রেসিডেন্ট স্টুডেন্ট ও কর্তব্যরত স্টাফ রুমের বাইরে চলে আসেন। পরে তাদের সরিয়ে সম্ভবত করিডোরের গেটটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমি বিনয়ের সঙ্গে তাকে শান্ত হতে ও বসতে বলি। পরিস্থিতি যেন আরও খারাপের দিকে না যায়, সেজন্য এ-ও বলি, উইথড্রো করার সময় আছে এবং যেহেতু আমি আরও দুটি পদে নমিনেশন সাবমিট করেছি, তাই আলোচনা করে উইথড্রো করা যাবে। এমতাবস্থায় তিনি ডা. হাসিব রহমানকেও ধমকের সুরে বলেন যে, আপনারা তাকে বসিয়ে এখানে চা খাওয়াচ্ছেন? বেয়াদবির মাত্রা আরেকটু চড়িয়ে তিনি বলেন, আমি দাঁড়িয়ে আছি আর আপনি বসে কফি খান? এ অবস্থায় আমি তাকে আবারও শান্ত হতে বললে, তিনি টেবিল চাপড়িয়ে কফির কাপটি ফেলে দেন। এমন পরিস্থিতিতে ডা. তানভীর আহমেদ একটি উইথড্রো পেপার এনে আমাকে তাতে সই করতে বলেন। সার্বিক দিক বিবেচনা করে আমি তাতে সম্মতি দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ওইদিন দুপুর ২টার দিকে পাশের কক্ষে (৩২৫ নম্বর কক্ষ) ইলেকশন কমিশন চেয়ারম্যানের কক্ষে প্রবেশ করি। নির্বাচন কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক নওয়াজেশ খান ও সদস্য অধ্যাপক খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। ডা. হাসিব রহমান ছাড়া ওই কক্ষে ডা. তানভীর আহমেদ, ডা. মনসুর রহমান, ডা. আইয়ুব হোসেন, ডা. মোর্শেদ কামাল ও ডা. ইমু প্রবেশ করেন। কক্ষে প্রবেশ করেই ডা. ইমু কমিশনের চেয়ারম্যান ডা. নওয়াজেশ খানের টেবিল থেকে মনোনায়নপত্র জোর করে কেড়ে নেন। তারপর আমার জমা দেওয়া ট্রেজারার পদের মনোনায়ন পত্রটি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে মেঝেতে ছুড়ে ফেলেন। এই কর্মকাণ্ড দেখে নির্বাচন কমিশনের চেযারম্যান ও মেম্বার তাদের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এ সময় আমি বলি, ইমু, এটা কিন্তু এক্সেস হয়ে গেল। এ কথা বলামাত্র ইমু আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে থাকেন। আমি মাথায় ও হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হই। আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে ডা. মোর্শেদ কামালও আঘাতপ্রাপ্ত হন।’
অভিযোগে তিনি আরও বলেন, ‘এমতাবস্থায় ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, নিজ কর্মস্থল, চেম্বার-ক্লিনিক কিংবা দেশের যে কোনো স্থানে, যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর অবস্থার শিকার হলে ডা. হোসেন ইমাম ওরফে ইমু সেজন্য দায়ী থাকবেন বলে আপনাকে লিখিতভাবে জানিয়ে রাখলাম।’
এ বিষয়ে তৎকালীন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি প্রকল্পগুলোর সমন্বয়কারীকে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি ভুক্তভোগীরা। অভিযুক্তের কোনো শাস্তি তো হয়নি, উল্টো নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অভিযোগকারী ডা. মো. মারুফুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে অন্যায় আচরণের বিষয়ে একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলাম। তার অনুলিপি তৎকালীন সচিবসহ স্বাস্থ্যের শীর্ষ ব্যক্তিদের পাঠিয়েছিলাম। আমার জানামতে, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য
ডা. হোসেন ইমাম ইমুর মোবাইল ফোনে গত মঙ্গলবার বেশ
কয়েকবার কল করার পর তিনি রিসিভ করেন। এই প্রতিবেদক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ওটিতে (অপারেশন থিয়েটারে) আছেন এবং সেখান থেকে বেরিয়ে কল ব্যাক করবেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। তবে গত চার দিনেও তিনি আর ফোন করেননি।