

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অভ্যন্তরে সহকারীরা মাঠ প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও তারা বছরের পর বছর বেতন কাঠামো, পদোন্নতি ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। নথি প্রক্রিয়াকরণ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, তথ্য উপস্থাপনসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কাজের বড় অংশটিই পরিচালিত হয় তাদের মাধ্যমে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, একজন জেলা প্রশাসক প্রায় ২০০টি সরকারি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, যার পরোক্ষ চাপ গিয়ে পড়ে প্রশাসনিক সহকারীদের ওপর। ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসে ২০২২ সালে এক বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ফাইল নিষ্পত্তি হয়েছে, যেগুলোর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ, নোট তৈরি, খসড়া প্রস্তুত করেছেন সহকারীরাই। ইউএনওদের ক্ষেত্রেও প্রতিদিন গড়ে ৫০-১০০টি ফাইল আসে, যার মধ্যে নির্বাচনী তদারকি থেকে শুরু করে ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ, প্রকল্পের বিল-ভাউচার পর্যন্ত থাকে। এ ফাইলচালনার মূলে থাকে মাঠ প্রশাসনের সহকারীদের নিরলস শ্রম। কিন্তু তারা বলেন, বছরের পর বছর কাজ করেও একবার মাত্র পদোন্নতির সুযোগ পান, তাও ‘উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ পদে।
২০১০ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অফিস সহকারী-কাম-মুদ্রাক্ষরিক পদকে আধুনিকায়ন করে কম্পিউটার দক্ষতা নির্ভর ‘অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর’ করা হলেও তা পরে বাতিল করে পুরোনো পদবি পুনর্বহাল করা হয়। ফলে, যারা নতুন দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, তারাও পদমর্যাদা ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে, প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা যেখানে ক্যারিয়ারে ৮-৯ বার পদোন্নতির সুযোগ পান, সেখানে সহকারীরা চাকরিজীবনের প্রায় তিন দশক একই পদে থেকেই অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ কালেক্টরেট সহকারী সমিতি (বাকাসস) ২০১৯ সাল থেকে বৈষম্যের প্রতিবাদে আন্দোলন করে আসছে। ২০২১ সালে তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ৮টি পদ একীভূত করে ‘সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ২০২২ সালের ১৬ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পর নতুন প্রজ্ঞাপনে পদগুলো তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়, যা সহকারীদের মতে আরও বৈষম্য সৃষ্টি করে।
বাকাসসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম এবং সভাপতি এস এম আরিফ হোসেন স্পষ্টভাবে বলেন, এক ধরনের কাজের জন্য তিনটি আলাদা পদ ও গ্রেড রাখা প্রশাসনিক ন্যায়বিচার লঙ্ঘন করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পেছনে কোনো আর্থিক বিষয় না থাকলেও তারা বৈষম্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সরকারের সামগ্রিক সেবার মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
সহকারীদের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে: প্রথমত, ২০২১ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৮টি পদ একীভূত করে ‘সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, অথবা তিনটি বিভাগীয় পদ একীভূত করতে হবে; দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালের মতো আবারও ‘অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর’ পদ পুনর্বহাল করতে হবে; এবং তৃতীয়ত, পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা মনে করেন, এ দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে মাঠ প্রশাসনের সহকারীদের হতাশা আরও বাড়বে, যা সরকারি কার্যক্রমের গুণমানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।