

দেশের পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। এদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রথম গর্ভধারণ করেন। প্রতি তিনজনের একজন নারী শ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন। প্রতি চারজনের একজন গর্ভপাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) মহাখালী ক্যাম্পাসের সাসাকাওয়া মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে এ তথ্য জানানো হয়। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহায়তায় অ্যাডসার্চ বাই আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত ২৪ মাসব্যাপী কোহর্ট গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনে এ সেমিনার আয়োজিত হয়। সেমিনারে এ সম্পর্কিত তিনটি পৃথক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ধরনের কোহর্ট গবেষণা বাংলাদেশে প্রথম।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকরা ঘর ও কর্মস্থল দুই স্থানেই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত ১২ মাসে নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তাদের স্বামীর সহিংসতার হার ছিল অনেক বেশি এবং যৌন সহিংসতা ছাড়া অন্য সব ধরনের সহিংসতা গত দুই বছরে আরও বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার হারও তাদের মধ্যে অনেক বেশি ছিল। গবেষণার শুরুতে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, যা দুই বছর পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে। সহিংসতার শিকার নারীরা প্রায় কেউই আনুষ্ঠানিক সাহায্য চাইতে যান না। শুরুতে ৩৫ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক (পরিবার বা বন্ধুদের কাছে) সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু এই হার ক্রমশ কমে দুই বছর শেষে দাঁড়ায় ২১ শতাংশে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনায়ও মাত্র প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন নারী শুরুতে কর্তৃপক্ষকে সহিংসতার কথা জানিয়েছিলেন এবং দুই বছর পর এসেও এ চিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
২০২২-এর আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণাটি রাজধানীর কড়াইল, মিরপুর বস্তি এবং গাজীপুরের টঙ্গী বস্তিতে আইসিডিডিআর,বির আর্বান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইলেন্সের আওতাধীন এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী মোট ৭৭৮ শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে প্রতি ছয় মাস অন্তর জরিপের মাধ্যমে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষকরা জানান, গবেষণার শুরুতে ৪৯ শতাংশ নারী তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা ছিল, যা দুই বছর শেষে ফলোআপে দেখা যায় সেটি বেড়ে ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি বা ট্যাবলেট সম্পর্কে জ্ঞানও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুরুতে ১৫ শতাংশ নারী এ সম্পর্কে জানতেন, যা পরে বেড়ে ৩৯ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে। পোশাক কারখানাগুলোয় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু পরামর্শমূলক সেবা থাকলেও দরকারি সরবরাহ সীমিত। জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা যেসব কারখানায় কাজ করেন, সেগুলোর মধ্যে ২২ শতাংশ কারখানায় স্যানিটারি প্যাড এবং ১৪ শতাংশ কারখানায় পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে যারা অন্তত ৯ বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং তুলনামূলক বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন, তাদের কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। যারা সন্তান ধারণের আগেই গর্ভনিরোধক ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তাদের কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কম পাওয়া গেছে। আবার যারা প্রথম গর্ভধারণের আগে তৈরি পোশাক শিল্পখাতে কাজ শুরু করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও কম ছিল। অন্যদিকে, স্বামীর দ্বারা সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকলে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বাড়ে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক আইসিডিডিআর,বির ইমিরেটাস সায়েন্টিস্ট ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থাপনাগুলোর ওপর আলোচনা করেন পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক ড. উবাইদুর রব, বিকেএমইএর যুগ্ম সম্পাদক ফারজানা শারমিন, মেরী স্টোপস বাংলাদেশের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও স্বাধীন গবেষক ইয়াসমিন এইচ আহমেদ।