

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে গ্যাং সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ অনেকটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে এখন এসব সংঘর্ষে জড়ানোর সময় নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টিও মাথায় রাখছে গ্যাং সদস্যরা। নামছে মাথায় হেলমেট পরে। প্রতিপক্ষের হামলা থেকে বাঁচার পাশাপাশি এই হেলমেটের আড়ালে নিজেদের পরিচয়ও গোপন রাখতে পারছে গ্যাং সদস্যরা। ক্যাম্পে সর্বশেষ সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গুলি ও বোমার সঙ্গে বেশকিছু হেলমেট উদ্ধারের পর এমন তথ্যই জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পের কুখ্যাত মাদক কারবারি ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, সেলিম আশরাফী ওরফে চুয়া সেলিম ও পিচ্চি রাজা গ্রুপের অনুসারীদের মধ্যে মাদক ও অস্ত্রের কারবার নিয়ে আধিপত্যের লড়াই ক্যাম্পে দফায় দফায় সংঘর্ষের মূল কারণ। এসব গ্রুপের অনুসারীরা মাদক ব্যবসার দখল নিতে গিয়ে প্রায়ই ককটেল ও অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি হয়। গত কয়েকদিনে একাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে তারা। এর মধ্যে গত বুধবার সংঘর্ষের একপর্যায়ে ককটেল বিস্ফোরণে জাহিদ (২০) নামে এক যুবক নিহত হয়। এই ঘটনার পর ক্যাম্পে একাধিক অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে পুলিশের অভিযানে ঘটনায় জড়িত অভিযোগে সানজু, সাজু, রোস্তম ও আরমান নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে যৌথ বাহিনীর অভিযানে আব্দুল্লাহ সারমান, ইমরান হোসেন আলম, মো. আকাশ ও মো. সোহেল নামে চারজন গ্রেপ্তার হয়। এর মধ্যে সোহেল শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল বাহিনীর ‘ম্যানেজার’ হিসেবে পরিচিত। অভিযানে ৭.৬৫ মিমি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ৩ রাউন্ড তাজা গুলি, ৪টি পেট্রোল বোমা ও বোমা তৈরির জন্য ব্যবহৃত খালি কাচের বোতল, দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র এবং ৩০টি পুরোনো হেলমেট উদ্ধার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সংঘর্ষের সময় অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই হেলমেট পরে। নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য হেলমেট পরে তারা দৌড়ে যায়, ককটেল ছোড়ে, গুলি চালায় এবং তারপর আবার গলির ভেতর মিলিয়ে যায়।
র্যাব-২-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্প-কেন্দ্রিক বেশকিছু গ্যাং রয়েছে। কয়েকদিন পরপরই এক গ্যাংয়ের সদস্যরা আরেক গ্যাংয়ের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এবারের অভিযানে বেশকিছু হেলমেট উদ্ধার করা হয়েছে। এসব হেলমেট তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার সময় ব্যবহার করে। এটা তাদের নিজেদের সুরক্ষার নতুন কৌশল হয়েছে।
সংঘর্ষের বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় তিন কুখ্যাত গ্যাং—চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা ও বুনিয়া সোহেল বাহিনীর মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে একাধিক হতাহতের ঘটনাও ঘটে বলে জানা গেছে। এর আগে গত ২১ অক্টোবর পিচ্চি রাজা বাহিনীর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী ৩২টি তাজা ককটেলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ২৩ অক্টোবর বুনিয়া সোহেল গ্রুপের সদস্য জাহিদ প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়।
জেনেভা ক্যাম্পে ৪০ হাজারের বেশি বাসিন্দার বসবাস। গত বুধবার সংঘর্ষের মধ্যে ককটেল বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনার পর থেক ক্যাম্পে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে এই সহিংসতা চলছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ অভিযান চালায়, কিছুদিন একটু চুপচাপ থাকে, তারপর আবার শুরু হয় আগের মতো। এরপর মারামারি-সংঘর্ষে কেউ নিহত হলে আবার কয়েকদিন অভিযান চলে।
এক নারী বাসিন্দা বলেন, ক্যাম্পের সবাই তো মাদক কারবারি নয়। আমরা সাধারণ বাসিন্দারা ভয় নিয়ে বাঁচি। জানি না কখন আবার ককটেল বিস্ফোরণ হবে। শিশুরা কাঁপে শব্দ শুনে, কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, একমাত্র প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে জেনেভা ক্যাম্পের এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্প থেকে মাদক এবং অস্ত্রের সাম্রাজ্য ধ্বংস করা যাবে না এই কথাটি এখনো বলা যাবে না; কিন্তু সেজন্য দরকার সঠিক পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছা। লোক দেখানো কয়েকটি অভিযান করে এই সাম্রাজ্য শেষ করা যাবে না। বরং ধীরে ধীরে এই ক্যাম্পে অপরাধের মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’
পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ক্যাম্পে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। ক্যাম্প যেন শান্ত থাকে, সে বিষয়ে তারা কাজ করছেন। মোহাম্মদপুর থানার ওসি কাজী মো. রফিকুল আহমেদ কালবেলাকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে ককটেল বিস্ফোরণে জাহিদ নামে এক যুবকের নিহতের ঘটনায় তার বোন মদিনা (২৫) বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আমরা অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছি। ক্যাম্পের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং অস্ত্র ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান নিয়মিত চলছে।